সমকালের প্রয়োজনে শিল্পের আয়োজন : পুজোর থিমে কৃষক আন্দোলন

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 2 weeks by admin

সৌম্য চট্টোপাধ্যায়, ১০ অক্টোবর, ২০২১ :

মণ্ডপে প্রবেশপথের শুরুতেই ব্যারিকেড, কাঁটাতার আর বিভিন্ন মাপের ছেঁড়াখোড়া জুতোর রাশি। ঠিক যেন ব্যারিকেড ভাঙতে চাওয়া জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণের ঝড় বয়ে যাওয়ার পরের মুহূর্তের ছবি। মুষ্টিবদ্ধ হাত আর “কিষাণ একতা জিন্দাবাদ” থেকে পরিষ্কার হয় এ’ছবি কোথাকার। এক বছর ধরে চলমান কৃষক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা ট্রাকটর এখানে ডানা মেলেছে – দু’ডানায় অজস্র লড়াই-আন্দোলন আর মানুষের নাম। চমকে উঠছেন দর্শনার্থীরা, সেল্ফি তোলার আগে এক বার হলেও পড়ে দেখছেন দেওয়ালের লেখাগুলো, মন্তব্য করছেন বিষয়টা নিয়েও। কিছু প্রতীক, কিছু নাম, দেওয়ালে আঁকা ছবি, কবিতার লাইন, আর স্লোগান দিয়ে এই পুজোর “থিম” রচনা করেছেন শিল্পী অনির্বাণ দাস ও তাঁর দল। দমদম পার্কের ‘ভারত চক্র’ ক্লাবের পুজোয় এই অভিনব আয়োজন।

পুজোয় হঠাৎ কৃষক আন্দোলন কেন? অনির্বাণের বক্তব্য – “সমকালকে উপেক্ষা করা শিল্পীর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রায় দেড় বছর ধরে যে অভূতপূর্ব কৃষক আন্দোলন চলছে দেশে তাকে ধরতে চেয়েছি আমার কাজে। এই আন্দোলনকে অষ্টাদশ শতক থেকে কৃষকদের একের পর এক লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় ফুটিয়ে তুলেছি। আমার এই কাজে তাই সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ, বারাসাত বিদ্রোহ, তেভাগা তেলেঙ্গানার লড়াই, ভবানী পাঠক, ইলা মিত্র, অহল্যা দেবী এই নামগুলো দেখতে পাবেন।” শুধু কৃষিকাজ, কৃষিভিত্তিক গ্রামজীবন নয়, সরাসরি কৃষকদের আন্দোলনের কথাই তুলে ধরা শিল্পীর সমকালীন দায়িত্ব হিসেবে মনে করছেন অনির্বাণ। লখিমপুরের কৃষক নিধনের ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে ধিক্কার বার্তাও তাই ঠাঁই পেয়েছে থিমে।

দেওয়ালে এক জায়গায় মোটরগাড়ির তলায় চাষির পিষে মরার ছবি আসলে লখিমপুরের হত্যালীলার আগেই তার কল্পনা থেকে রূপ দিয়েছিলেন – এমনটাই জানালেন শিল্পী। সেই কল্পনা পরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তব ঘটনার ছবি হয়ে উঠেছে। মূল মণ্ডপের ভেতর অসুর নিধনকারী দুর্গা নয়,  চাষী-ঘরের মেয়ের মৃন্ময়ী রূপ ঠাঁই পেয়েছে। দমদম পার্কের পুজোটিতে শিল্পীর এই আবেগঢালা আয়োজন দেখতে দেখতে দর্শনার্থীদের কানে ভেসে আসছে “হেঁই সামালো ধান হো, কাস্তেটা দাও শান হো”। তেভাগার জানকবুল লড়াইয়ের এই গানের আবহে আজকের কৃষক আন্দোলনের থিম আবেগের সঞ্চার করে দর্শকদের মনেও।

কিন্তু এই আয়োজন আবার কারুর কারুর গাত্রদাহের যথেষ্ট কারণ হয়েছে তাও বোঝা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে বিজেপি ঘনিষ্ঠ এক আইনজীবী মামলাও দায়ের করেছেন জুতো ব্যবহার করে থিম রচনায় “হিন্দু দেবীকে অসম্মান” এর অভিযোগে! সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে জোরদার চর্চা চলছে গত কদিন ধরে। এ’সব প্রশ্নে শিল্পীর স্পষ্ট জবাব – “যেকোনো মন্দিরে আমরা দেখি বাইরে জুতো রাখার র‍্যাক থাকে। এখানে তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? আমার এই কাজে মণ্ডপটি হল ধানের খেত, তার বাইরে মণ্ডপে প্রবেশের আগে জুতো ব্যবহার করা হয়েছে শিল্পকর্মে। এতে দেবীকে অসম্মানের প্রশ্ন কোনভাবেই আসেনা। বাইরে যেখানে জুতো ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানেই পায়ের জুতো খুলে রেখে মানুষ মূল মণ্ডপে প্রবেশ করতে পারেন।” ক্লাবের তরফ থেকেও জানানো হয়েছে তাঁরা শিল্পীর এই সৃষ্টির কোনও পরিবর্তন করতে চান না।

দুর্গাপূজার উৎসবের মাঝে সমকালকে ধরতে চাওয়ার এই শৈল্পিক প্রয়াস সত্যিই সাহসিকতার পরিচয় দেয়। “ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না” – দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলা এই কথাগুলোই যেন একাংশের তোলা বিতর্ক আর সমালোচনার বিপরীতে যা বার্তা দেওয়ার দিয়ে যাচ্ছে ।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on সমকালের প্রয়োজনে শিল্পের আয়োজন : পুজোর থিমে কৃষক আন্দোলন

Leave A Comment