উত্তরপ্রদেশে রামের মূর্তি তৈরির জন্য উচ্ছেদ হতে চলেছেন গ্রামবাসীরা

আজকের খবর বিশেষ খবর

Last Updated on 9 months by admin

অযোধ্যায় সবচেয়ে উঁচু রামের মুর্তি বানানোর জন্য আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে গ্রামবাসীদের উৎখাত করতে চাইছে আদিত্যনাথের সরকার। ‘বাবরি মসজিদ – রাম জন্মভূমি’  রায় বেরনোর পর দীর্ঘদিন ধরেই চলছে সেই প্রক্রিয়া। এতেই বিক্ষুব্ধ এলাকার লোকজন।

২০১৯ সালের নভেম্বরে বিতর্কিত বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমিতে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে খুশি হয়েছিল উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা জেলার গ্রাম পঞ্চায়েত মাঝা বারহাতার হিন্দু বাসিন্দারা। কিন্তু ২০২০ সালের জানুয়ারির শেষদিকে তাদের এই আনন্দ হতাশায় পরিণত হয়। ইতিপূর্বেই অযোধ্যা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অনুজ কুমার ঝা এর কার্যালয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যে রাম মূর্তি তৈরির জন্য মাঝা বারহাতার ৮৫.৯৭৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। ঐ অঞ্চলের বাসিন্দাদের মতে-সে বছর আগস্টে, প্রশাসনের সাত বা আটজন অধিকর্তা গ্রাম পঞ্চায়েত পরিদর্শন করেছিলেন এবং তাদের বলেছিলেন যে, মূর্তিটি নির্মাণের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া জমির মাপের (৮৫.৯৭৭ হেক্টর) চেয়ে বেশি জমি নেওয়া হবে। বাসিন্দাদের বক্তব্য যে, সরকারি আধিকারিকরা তাদের যা বলেছিলেন তার উপর ভিত্তি করে দেখা গেছে যে এই প্রস্তাবনায় স্থানীয়ভাবে পঞ্চায়েতের চারটি অঞ্চলকে (ন্যূর কা পূর্বা দলিত বাস্তি, ধর্মু কা পূর্বা এবং ছোট মুঝনিয়া) উল্লেখ করা হয়েছে। অযোধ্যা রায়ের প্রায় এক বছর আগে, উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী অজয় ​​সিংহ বিশত এক বিরাট রাম মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে, রাজ্য সরকার এই কাজের জন্য অযোধ্যার অন্য একটি গ্রাম মীরপুর মাঝাকে বেছে নিয়েছিল, তবে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি — স্থানীয়রা এই প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল এবং অযোধ্যা প্রশাসনের একটি প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা দল স্থানটির অবস্থান সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। জুলাই ২০১৯ এর মধ্যে, মিডিয়া জানিয়েছিল যে প্রস্তাবিত রাম মূর্তির উচ্চতা ২৫১ মিটার যা বিশ্বের দীর্ঘতম হবে। আদিত্যনাথ মূর্তি প্রাঙ্গণটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে কল্পনা করেছিলেন। যেখানে থাকবে ডিজিটাল যাদুঘর,  গ্রন্থাগার, পার্কিং, ফুড প্লাজা, শ্রী রামের থিমের উপর ভিত্তি করে ল্যান্ডস্কেপিং ইত্যাদি। ২০২০-র আগস্টে প্রশাসনের আধিকারিকরা জমি পরিদর্শন করেছেন এবং তারা জানিয়েছিলেন যে বিজ্ঞপ্তিতে ৮৬ হেক্টরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হবে। গ্রামের বাসিন্দারা বলেছেন যে তারা ‘সরকারি আধিকারিক’রা তাদের জানান যে তাঁরা একটি “জরিপ বিভাগ” থেকে এসেছেন।

এলাহাবাদ হাইকোর্টে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। মামলাদায়েরকারী বাসিন্দা অরবিন্দ কুমার যাদবের মতে-“এই পদক্ষেপের ফলে এক হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাদের বেশিরভাগই অত্যন্ত গরীব, পশ্চাৎপদ-বর্ণ গোষ্ঠীর এবং চাষের কাজ করেন। যখন অযোধ্যা তে একটি বিশাল রামমন্দির তৈরি হচ্ছে, তখন এই মূর্তির কী দরকার ? কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা কি ঠিক?”  তিনি বলেন-“আমরা জল সমাধি করব” – “নিজে জলে ডুবে মরব, তবুও আমাদের জমি দেব না”। অরবিন্দের কথা অনুযায়ী জানা যায়, ১৯৯০-এ করসেবার সময় ওই গ্রামে কয়েক হাজার করসেবক বাস করতেন। গ্রামবাসীরাই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। গত নভেম্বরে এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার সময় ঢাক ঢোল বাজিয়ে আবির খেলে উদযাপন করেছেন গ্রামের মানুষ, কিন্তু এখন এই মূর্তি তৈরীর জন্য এদেরকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে যোগীর সরকার। গ্রামবাসীদের প্রশ্ন, “এই মূর্তির জন্য যদি আমাদের বাড়ি জমি দিতে হয়, তবে আমাদের বাচ্চারা কী করবে, তারা কীভাবে বাঁচবে?”

 

অরবিন্দ এখন এই মূর্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে পরেই তিনি হাইকোর্টে যান। গ্রামবাসীরা বলেন যে তারা কয়েক দশক ধরে এই জমিতে বসবাস করেন। অরবিন্দ বলেন যে ব্রিটিশ রাজত্বকালে তাঁর পূর্বপুরুষরা এই জায়গাটি নিয়েছিলেন এবং আজ অবধি এই জমি সংক্রান্ত যে সমস্যার মুখোমুখি তারা হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা সমাধান করা হয়নি।

বাসিন্দারা বলেন যে গরীবদের তাড়িয়ে মাঝা বারহাতায় মূর্তি তৈরীর প্রয়োজনীয়তা ছিলনা। সঞ্জয় কুমার যাদব নামে এক আখচাষী বলেন- “এখন যখন অযোধ্যায় মন্দির তৈরি হচ্ছে, তখন কোনও মূর্তি স্থাপনের কোনও যৌক্তিকতা নেই। এটির পূজাও হবে না। মূর্তির মুখ এত উঁচুতে হবে যে তা ঠিকভাবে দেখাও যাবে না। আমরা নিপীড়িত, ‘নিচুজাতি’ এবং চাষীরা নিত্যদিনের সমস্যায় জর্জরিত, চাষীরা সময়মত আখের দামও পায় না।” এমন অবস্থায় ওই এলাকাতে রামের মূর্তি বানানোতে সায় নেই গ্রামের অধিবাসীদেরই।

প্রশাসনের তরফে সুস্পষ্ট যোগাযোগের অভাব বাসিন্দাদের উদ্বেগকে বাড়িয়ে তোলে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত ৮৬.৯৭৭ হেক্টর নাকি তার বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে সে বিষয়  প্রশাসন কোনও স্পষ্টতা দিতে রাজি নয়। গ্রামের বাসিন্দা, আনারা বলেন যে মাঝা বারহাতায় তাঁর পরিবার বাঁচার লড়াই চালাচ্ছিল। গ্রামবাসীদের কথায়, “এলাকার মানুষজন ভোট দিয়ে যোগীকে সরকারে এনেছিলেন অথচ এই বিপদের মুখে মোদী এবং যোগীর কোনও সমর্থন আমরা পাচ্ছি না”।

চামার সম্প্রদায়ের সদস্য বিমলা দেবী বলেন, “সরকার বাসিন্দাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করছে। এটি ‘উচ্চবর্ণের সরকার’, আদিত্যনাথকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ওনার সন্তান নেই, এই কারণেই তিনি এই পাট্টাগুলির মূল্য বুঝতে পারছেন না। আমরা কি অযোধ্যাবাসী নই? আমরা কি রামের উপাসনা করি না?” বিমলা বলেন, “আমরা সবাই মরে যাব, কিন্তু আমরা আমাদের বাড়ি ছাড়ব না।”

রামের নামে দাঙ্গার পর তাই অযোধ্যাবাসী এবার দেখতে চলেছে, রামের নামে বাস্তুচ্যুত করার প্রয়াসও। দলিত গ্রামগুলিকেই লক্ষ্য করেছে ‘উচ্চবর্ণ’ এর সরকার। অবশ্য রামরাজ্যে শম্বুকদের জায়গা কবেই বা ছিল?

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on উত্তরপ্রদেশে রামের মূর্তি তৈরির জন্য উচ্ছেদ হতে চলেছেন গ্রামবাসীরা

Leave A Comment