আজ কা রবিন হুড: পেট্রল- ডিজেলের দাম ও জনকল্যাণ

অর্থনীতি পর্যালোচনা মতামত

Last Updated on 7 months by admin

রাজেশ ভট্টাচার্য

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার তাদের জনকল্যাণমুখী নানা প্রকল্পের কথা তুলে ধরে সবসময় দাবি করে যে আগের সরকারের তুলনায় তারা কত দক্ষতার সঙ্গে (মানে, অপচয় আর দুর্নীতি বন্ধ করে) এই প্রকল্পগুলোর সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। অন্যদিকে ২০১৪ সাল থেকে এই সরকারের আমলে পেট্রল-ডিজেল- এলপিজি’র দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, যার আর্থিক বোঝা সাধারণ মানুষের ওপরেই চাপছে। তেলের এই ক্রমবর্ধমান দামের জন্য কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করা যাবে না। গত কুড়ি বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের (ভারতীয় বাস্কেটের) বার্ষিক গড় দাম সবচেয়ে বেশি ছিল ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে– ইউপিএ সরকারের শেষ তিন বছরে — যখন  ব্যারেল প্রতি দাম ১০৫.৫২ থেকে ১১১.৮৯ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। সেই তুলনায় এই বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গত আর্থিক বছরের দশ মাসে এর গড় দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৪০.৮৭ ডলার।

দেশের জনগণ তেল ভরতে গিয়ে গ্যাস স্টেশনে যে দামটা দেন, সেটা শুধু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা তেলের দামের ওপর নির্ভর করে না—ডলারের সঙ্গে ভারতীয় টাকার বিনিময় হার, পেট্রল- ডিজেলের ওপর প্রযোজ্য কর এবং আরও অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। এই বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনায় আসার আগে এটা জেনে রাখা দরকার যে ভারতবর্ষে পেট্রল-ডিজেলের বাজারের দামের সিংহভাগ হচ্ছে কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের চাপানো কর। গত বছর বেশ কিছু সংবাদপত্রে বহু-আলোচিত একটি খবর ছিল যে  পেট্রল-ডিজেলের পাইকারি মূল্যের ৬৯ শতাংশই হচ্ছে কর — এই করের হার পৃথিবীর সমস্ত দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ কয়েকটির মধ্যে পড়ে (সূত্র: https://www.indiatoday.in/business/story/india-fuel-excise-duty-hike-69-per-cent-petrol-diesel-highest-in-world-1674936-2020-05-06)।

গত দশ বছরে তেলের দামের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নীতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ২০১০ সাল অবধি দেশের বাজারে পেট্রল-ডিজেলের দাম সরকার নিয়ন্ত্রণ করত। কেন্দ্রীয় সরকার  ২০১০ সালে পেট্রল আর ২০১৪ সালে ডিজেলের দামকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে। অর্থাৎ, ভারতবর্ষের তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলো এরপর থেকে তেলের পাইকারি দাম নির্ধারণ করতে পারবে এবং প্রতি দু-সপ্তাহে তেলের দাম সংশোধন করতে পারবে। ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই থেকে প্রতিদিন তেলের দাম সংশোধিত হতে শুরু করে—উদ্দেশ্য ছিল দামের অস্থিরতা এবং বাড়াবাড়ি রকমের ওঠানামা থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষিত রাখা। অতীতে, ২০১৪ সালের আগে অবধি অন্তত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে করের বোঝা কমিয়ে নাগরিকের কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু উল্টোটা হয়নি। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সঙ্গে আসলে দেশের বাজারে তেলের পাইকারি দাম ওঠানামা করেনি—দাম বাড়ার বোঝা চেপেছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে, দাম কমার স্বস্তিটুকু মেলেনি।

এই মুহূর্তে তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গাস ও ষ্টীল মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, যে পেট্রল-ডিজেলের ওপর কর কমানো সম্ভব নয়—কারণ পরিকাঠামো ও জনকল্যাণ খাতে সরকারের খরচ করতে গেলে টাকা লাগে  এবং এই করের টাকাতেই সেই খরচ করা সম্ভব হয়। ভাল রাস্তা, শুদ্ধ পানীয় জল, সন্তানদের জন্য  ভাল শিক্ষা—এইসব চাইলে এই করের বোঝা বইতেই হবে— ওঁর নিজের ভাষায়, “দোনো হাথ মে লাড্ডু নেহি হো সাকতে”। (সূত্রঃ https://energy.economictimes.indiatimes.com/news/oil-and-gas/dharmendra-pradhan-for-petrol-diesel-pricing-under-gst-regime/60808173)।

তাহলে কী দাঁড়াল? উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলোর ওপর ট্যাক্স বাড়ানো যাবে না, দেশের সরকারি-বেসরকারি তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলোর মুনাফা সুনিশ্চিত করতে হবে—অতএব সাধারণ মানুষকেই অতিরিক্ত কর দিয়ে কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধে কিনতে হবে—এক হাতে ফেল কড়ি, অন্য হাতে মাখ তেল।

এবার দেখা যাক, তেলের দামের রহস্যটা কী। নিচের লেখচিত্রে ২০০২-০৩ থেকে ২০২০-২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের (ভারতীয় বাস্কেটের) এবং দিল্লীতে পেট্রল এবং ডিজেলের বার্ষিক গড় দাম কিভাবে বদলেছে তা দেখতে পাওয়া যাবে। এখানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যারেল প্রতি ডলারের দামকে  লিটার প্রতি ভারতীয় টাকায় রূপান্তরিত করা হয়েছে (তেলের ব্যারেল প্রতি ডলারের দামকে আমেরিকান ডলার এবং ভারতীয় টাকার বিনিময় মূল্য দিয়ে গুণ করা হয়েছে এবং এক ব্যারেল= ১৫৯ লিটার এই হিসাব ধরে নেওয়া হয়েছে)।   

উপরের লেখচিত্র থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে ২০১৪ সাল অবধি (এবং যে সময়ে দেশীয় বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রিত ছিল) তেলের পাইকারি মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দামের সঙ্গে ওঠানামা করেছে, অথচ বিনিয়ন্ত্রণের পরে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের পরে, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশের পাইকারি বাজারে তেলের দাম মোটের ওপর তার অনেকটা উপরেই থেকে গেছে পুরো সময়টা জুড়ে। বর্তমানে তেলের দামটা একটু ভেঙে দেখা যাক।

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা প্রচার চলছে, যে রাজ্যগুলোই নাকি তেলের ওপর কর থেকে সবচেয়ে লাভ করে। এটা ঘটনা যে, কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য কোনও সরকারই তেলের ওপর করের হার কমাতে উৎসাহী নয়। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, জিএসটি চালু হওয়ার পর রাজ্য সরকারের মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে কর চাপিয়ে রাজস্ব আদায় করার স্বাধীনতা আছে— পেট্রল- ডিজেল, অ্যালকোহল আর জমি-বাড়ির ওপর স্ট্যাম্প ডিউটি এবং রেজিস্ট্রেশান ফী। এবং দেশের প্রত্যক্ষ কর নীতি (আয় কর, কর্পোরেট ট্যাক্স ইত্যাদি) সম্পূর্ণটাই নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় সরকার। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায় যে দিল্লীতে এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি পেট্রল আর ডিজেলের দাম কিভাবে নির্ধারিত হয়েছে। নীচের সারণী থেকে পরিষ্কার যে পেট্রোলের চূড়ান্ত দামের ৩৬.৮৪ শতাংশ হচ্ছে কেন্দ্রীয় কর (excise duty) এবং ২৩.০৮ শতাংশ হচ্ছে রাজ্যের কর (VAT)। ডিজেলের ক্ষেত্রে এই দুটো যথাক্রমে ৩৯.৮৯ আর ১৪.৬৫ শতাংশ। অন্য একটি সূত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে অশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ওপর কর/শুল্ক ইত্যাদি বাবদ কেন্দ্রীয় কোষাগারে যে টাকা এসেছে তার পরিমাণ ২০১৪-১৫ সালের তুলনায় ২০১৯-২০ সালে ১২৮.২% বেড়েছে (সূত্র: Petroleum Planning and Analysis Cell, Ministry of Petroleum and Natural Gas, Got. of India) । রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ৩৭.৬ %। 

Retail Selling Price at Delhi- (Rounded)
ElementsPetrol (Rs./litre)Diesel (Rs./Litre)
Base Price31.8233.46
Freight etc.0.280.25
Price Charged to Dealers
(excluding Excise Duty and VAT)
32.133.71
Add : Excise Duty32.931.8
Add : Dealer Commission (Average)3.682.51
Add : VAT (including VAT on Dealer Commission)20.6111.68
Retail Selling Price at Delhi- (Rounded)89.2979.7
Source: IOCL

শুধু তাই নয়, বর্তমানে কেন্দ্র রাজস্ব হিসেবে যে টাকাটা পেট্রল-ডিজেল থেকে তুলছে, তার ৬২ শতাংশ (পেট্রোলের ক্ষেত্রে) এবং ৬৯ শতাংশ (ডিজেলের ক্ষেত্রে) সেস হিসেবে তুলেছে—অর্থাৎ, এই টাকাটা রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রকে ভাগ করে নিতে হবে না। ২০১৩-১৪ সালে ট্যাক্স বাবদ কেন্দ্রীয় সরকারের মোট রাজস্বে সেসের পরিমাণ ছিল ৯%, এখন সেটা ১৭% -এ এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রসঙ্গে, সাম্প্রতিক কালে অর্থমন্ত্রীর  বক্তব্যের একটি বিশেষ অংশ বিশেষ অর্থবহন করে। কয়েকদিন আগে পেট্রল-ডিজেলের দাম বৃদ্ধি বিষয় বলতে গিয়ে উনি বলেছেন, যে এটা বেশ জটিল বিষয়—কেন্দ্র/রাজ্য সমন্বয় না থাকলে এর  সমাধান দুরূহ। ওঁর ভাষায়, “আমি এটা করতে পারি (কর কমানো), যদি আমার কাছে এক ধরনের নিশ্চয়তা থাকে যে আমি যে  রাজস্ব হারাবো সেটা  যেন অন্য কারুর লাভ করার সুযোগ না হয়ে দাঁড়ায়“। (সূত্রঃ https://zeenews.india.com/economy/fm-sitharaman-says-bringing-petrol-diesel-under-gst-regime-could-help-in-lowering-fuel-prices-2343528.html)। অর্থমন্ত্রী এটাও বলেছেন যে পেট্রল – ডিজেল কে জিএসটি র আওতায় আনলে (অর্থাৎ রাজ্যের করের আওতার বাইরে আনলে) এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। ভারতবর্ষের মত একটা বিশাল দেশে অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারের প্রতি এই বিশেষ মনোভাব –যা স্বভাবতই ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল ভাবনার বিরোধী– বুঝতে গেলে বিজেপি দলের রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক নেতা এম. এস. গোলওয়ালকার-এর লেখা পড়ে দেখতে হবে, যেখানে উনি স্পষ্টভাবেই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বদলে কেন্দ্রীভূত এবং ঐকিক শাসনব্যাবস্থার পক্ষে সওয়াল করেছেন। সেটা অন্য লেখার বিষয়। আমরা এই লেখার আলোচ্য বিষয়ে  ফিরে আসি। 

জনকল্যাণমূলক কাজকর্মের হালটা কী? এই বছর, অর্থাৎ ২০২১-২২ সালেরে বাজেটে পেট্রলিয়ামের জন্য বরাদ্দ ভর্তুকি হচ্ছে ১২৯৯৫ কোটি টাকা, যেখানে গত বছর সেটা ছিল ৪০৯১৫ কোটি টাকা। এই ভর্তুকি মূলত এলপিজি এবং কেরোসিনে দেওয়া হয়। এই ভর্তুকি হ্রাসের ফলে Direct Benefit Transfer scheme এ যে কুড়ি কোটি মানুষ সস্তায় এলপিজি পেত তাদের এখন থেকে বাজারের দামেই গ্যাস  সিলিন্ডার কিনতে হবে। এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে যেটুকু ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছে সেটা মূলত “ঊজ্জ্বালা” প্রকল্পেই খরচ হবে। গরিব কৃষকদের ক্ষেত্রে ডিজেল যে একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনের খরচ—সেটা এই কেন্দ্রীয় সরকার বিবেচনা করবে এটা আশা করা বাতুলতা। অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, ক্ষেত থেকে বাজারে নিয়ে যাবার খরচা বাড়বে—সুতরাং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। উদাহরণ বাড়িয়ে আর লাভ নেই। আমরা সবাই জানি তেলের দাম বাড়লে কি হয়।

কেউ কেউ বলেছেন পেট্রল- ডিজেলের দাম বৃদ্ধি নাকি এই সরকারের  রবিন হুড রাজনীতি (https://theprint.in/opinion/excise-duties-robinhood-politics-why-fuel-prices-are-rising-despite-low-global-rates/592285/)। এর ফলে নাকি বড়লোকদের ট্যাক্স করে গরীবদের টাকা দেওয়া যাবে। সরকারও এই প্রচার চালাবে –সন্দেহ নেই। যেন পেট্রল – ডিজেলের অতিরিক্ত দাম সমাজের ছোট্ট, বিত্তবান অংশ —যাদের নিজের গাড়ি আছে, বা বাইক/ স্কুটার আছে – শুধু তাদের ওপরেই পড়বে। এই কুযুক্তির উত্তরে শুধু এটাই বলতে হয়—২০১৯ সালে এক ধাক্কায় কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর পর ভারতবর্ষ পৃথিবীর সেই সব দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে যেখানে কর্পোরেট ট্যাক্স  সবচেয়ে কম আর পেট্রল – ডিজেলের দামের ওপর  ট্যাক্সের হার  সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, বড়লোকের কাছ থেকে সরাসরি টাকা নিয়ে (যেমন, কর্পোরেট ট্যাক্সের মতন প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে) গরিবের মধ্যে তা না  বিলিয়ে দিয়ে, পেট্রল – ডিজেলের ওপর পরোক্ষ কর  (excise duty, sales tax, VAT) চাপিয়ে গরিবের ভাল করার এক বিচিত্র খেলায় নেমেছেন আজ কা রবিন হুড ।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on আজ কা রবিন হুড: পেট্রল- ডিজেলের দাম ও জনকল্যাণ

Leave A Comment