পুলওয়ামা বালাকোট ও রাজনীতি

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত রাজনীতি

Last Updated on 5 months by admin

পুলওয়ামার মর্মান্তিক ঘটনা পশ্চিম বাংলার নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবার ন্যক্কারজনক ভাবে পুলওয়ামার শহিদদের মোদিজী তার সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে ব্যবহার করছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক বাহিনীর স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক ফিরে দেখা দরকার।ফ্যাসিবাদের একটি সূচক ফ্যাসিবাদী দলের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ….. লিখছেন প্রণব কান্তি বসু।

পুলওয়ামা  বালাকোট ও রাজনীতি

প্রণব কান্তি বসু

 

পুলওয়ামার মর্মান্তিক ঘটনা পশ্চিম বাংলার নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবার ন্যক্কারজনক ভাবে পুলওয়ামার শহিদদের মোদিজী তার সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে ব্যবহার করছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক বাহিনীর স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক ফিরে দেখা দরকার।

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র যন্ত্রের বিভিন্ন অঙ্গগুলির – রাজনৈতিক ক্ষমতা, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী – মধ্যে আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্য থাকে। এর উদ্দেশ্য ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ করা। কিন্তু এই সমস্ত অধিকার অস্বীকার ক’রে ফ্যাসিবাদী শক্তি রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অঙ্গের ওপর দখল কায়েম করতে চায়। ফ্যাসিবাদের ঈপ্সিত শাসন ব্যবস্থা একদলীয় শাসন। আমাদের দেশকে সম্পূর্ণ ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে হয়তো চিহ্নিত করা উচিত নয় প্রধানত বহুদলীয় আপাত গণতন্ত্র এখনও আছে বলে। তবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গগুলির স্বাতন্ত্র্য, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও অধিকারের জন্য খুব জরুরী, ক্রমশ খর্ব হচ্ছে। এর একটা প্রমাণ সামরিক বাহিনীর রাজনীতিকরণ।

দি স্ক্রোল পত্রিকার ২৫শে মে, ২০১৯ সংখ্যায় সীমা সুরক্ষা বলের, অবসর প্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিজি, সঞ্জীব কৃষ্ণন সুদ, লেখেন ‘ভারতের সামরিক বাহিনীর যে খুব দ্রুত রাজনীতিকরণ ঘটছে তার প্রমাণ কর্মরত সামরিক আধিকারিকরা একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত হচ্ছেন এবং অবসরের পরেই বরিষ্ঠ আধিকারিকরা রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন’। এই পর্যবেক্ষণ নাজি আমলে সামরিক বাহিনীর আধিকারিকদের নাজি পার্টিতে অংশ নেওয়ার কথা মনে আনে। তিনি আরও বর্ণনা করছেন কি ভাবে আরএসএস সীমান্ত এলাকার মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিত করছে। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কি ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার একাধিক উদাহরণ উনি দিয়েছেন। যেমন ২০১৯ সালে মোদির অনেক নির্বাচনী বক্তৃতা মঞ্চের পেছনে পুলওয়ামা জঙ্গি হানায় নিহত সৈন্যদের ছবি প্রদর্শিত হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী অন্য দু জন দক্ষ এবং বেশী অভিজ্ঞ আধিকারিকদের অগ্রাহ্য করে বিপিন রাওয়াতকে স্থল বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয় রাজনৈতিক কারণে। এরকম আরও কয়েকটি উদাহরণ উনি দিয়েছেন। এ ছাড়া, তার মতে অবসরের পর পর সামরিক আধিকারিকদের শাসক দলে যোগদানের প্রবণতা বাড়ছে। সব চেয়ে আশঙ্কাজনক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সম্বন্ধে তৎকালীন স্থল বাহিনীর প্রধান, রাওয়াতের মন্তব্য। যখন কপিল মিশ্রর মত হিন্দুত্ববাদীদের দেখা যাচ্ছে প্রকাশ্যে প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে হিংসার উস্কানি দিতে, তখন উনি বললেন যে আন্দোলন বিপথগামী। আন্দোলনকারীরা লুঠ-তরাজ, অগ্নি সংযোগের জন্য নাকি দায়ী। আমরা যদি ভুলেও যাই হিন্দুত্ববাদীদের ভূমিকা, তা হলেও বলতে হয় যে একটি রাজনৈতিক বিবাদে সরাসরি সামরিক কর্তার পক্ষপাতিত্বের প্রকাশ গণতন্ত্রের রীতি বিরোধী।

পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে আমাদের আলোচনা আজকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ আবার পুলওয়ামা বালাকোট মোদী সাহেবের প্রচারের কেন্দ্রে চলে এসেছে। সেই মর্মান্তিক দিন মোদী সাহেবের কর্মসূচী ফিরে দেখলে বীর জাওয়ানদের প্রাণনাশ তাকে বাস্তবে কতটা পীড়িত করেছিল তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, দুপুর ৩.১০ মিনিটে জঙ্গি হানায় চল্লিশ জন জাওয়ান প্রাণ হারায়। তখন মোদী সাহেব কর্বেট ন্যাশনাল পার্কে ডিস্কভারী চ্যানেলের বেয়ার গ্রিল্সের সঙ্গে ‘ম্যান ভারসেস ওয়াইল্ড’ তথ্য চিত্রের শুটিং নিয়ে ব্যস্ত। ৫.১০ মিনিটে উনি মোবাইল ফোন মারফৎ রূদ্রপুরে ভারতীয় জনতা পার্টির জনসভা সম্বোধন করেন। তখনও পুলওয়ামা নিয়ে কিছু বলার ফুরসত পান নি। তার সময় হল এপ্রিল-মে মাসে লোকসভার জন্য নির্বাচনী প্রচার কালে। তিনি প্রায় সমস্ত নির্বাচনী প্রচারে জাতীয়তাবাদি জিগির তোলার জন্য পুলওয়ামা র ঘটনা নিয়ে বললেন শুধু না, মঞ্চের পেছনে থাকত পুলওয়ামাতে নিহত জাওয়ানদের ছবি। এটা য্যাসিবাদী কায়দায় সামরিক বাহিনীর রাজনীতিকরণের অপর দিক। এক দিকে সামরিক আধিকারিকরা রাজনৈতিক মত প্রকাশ করছেন, অবসরের পর দলে নাম লেখাচ্ছেন; অন্য দিকে জাওয়ানদের বলি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সামরিক বাহিনী কেমন ফ্যাসিবাদের পাঁকে মাখামাখি হয়ে গেছে তা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল বালাকোটের তথাকথিত সার্জিকাল স্ট্রাইকের সঙ্গে শ্রীযুক্ত অর্ণব গোস্বামীর যোগ জনসমক্ষে আসার পর। ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ভারতীয় বায়ু সেনা পাকিস্তানের বালাকোট অঞ্চলে জঙ্গি সংগঠন জাইশ-ই-মহম্মদের একটি শিবিরে হানা দেয়। পুলওয়ামার পর পর এই হামলাকে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ বলে ২০১৯-এর লোক সভার নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি বার বার ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদী হিস্টিরিয়া উস্কে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করতে। হালে অর্ণবের বিরুদ্ধে একটা জালিয়াতি মামলায় পুলিস যে অভিযোগ পত্র দাখিল করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে বালাকোটের হানার তিন দিন আগে এই মামলার আর এক আসামী, পার্থ দাস গুপ্তের সঙ্গে আসন্ন অভিযানের স্পষ্ট ইঙ্গিত অর্ণব দিচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে সামরিক বাহিনীর স্বাতন্ত্র্য, রাজনীতির থেকে তার দূরত্ব এবং গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে। বস্তুত, ফ্যাসিবাদের এটা একটা লক্ষণ যে সামরিক বাহিনী, ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যম মিলে মিশে একটি ভয়ঙ্কর অগণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করে।

  • এই বিভাগে মতামত লেখকের নিজস্ব 
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on পুলওয়ামা বালাকোট ও রাজনীতি

Leave A Comment