৯ বছর অন্যায় শাস্তি ভোগের পর জামিন পেলেন মারুতির শ্রমিক নেতা রাম বিলাস

আজকের খবর বিশেষ খবর শ্রমিক-আন্দোলন

Last Updated on 2 days by admin

বিশেষ সংবাদদাতা, ২৫ নভেম্বর, ২০২১ :

দমন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় কৃষক আন্দোলনে ঐতিহাসিক বিজয়ের হয়েছে। এবার শ্রমিক আন্দোলনে মারুতি কারখানার শ্রমিক রামবিলাস জামিন পেলেন। এই ঘটনা সংগ্রামরত মারুতি শ্রমিকদের এক নতুন আশার আলো এনে দিয়েছে।

রামবিলাস, মারুতি সুজুকি মানেসার প্ল্যান্টের ১৩ জন শ্রমিকের একজন,  যিনি নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্যায্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করলেন। অবশেষে তিনি চণ্ডীগড় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেন।

উল্লেখ করা যায়, অন্যায় শাস্তির মুখোমুখি হওয়া দুই শ্রমিক পবন দাহিয়া ও জিয়ালালের এই বছর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

গত ২৪ নভেম্বর পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে এই বন্দী থাকা মারুতি শ্রমিকদের জামিন আবেদনের শুনানি চলছিল, যার মধ্যে অন্যতম রামবিলাস জামিন পেয়েছেন। অন্য দশজন শ্রমিকের আবেদনের শুনানি হবে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে। শ্রমিকদের পক্ষে মামলায় ছিলেন বরিষ্ট আইনজীবী এপিএস দেওল।

আসলে কী ঘটেছিল, যার জন্য শাস্তির মুখে পড়েছেন মারুতি শ্রমিকরা

১৮ জুলাই, ২০১২ সাল, মারুতি সুজুকি, মানেসার প্ল্যান্টে একটি ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনায়, একজন সুপারভাইজারের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় কর্তৃপক্ষের অন্তর্নিহিত বিবাদ ও ষড়যন্ত্র ছিল বলে অভিযোগ আছে। তাই সেই ষড়যন্ত্রকে ধামা চাপা দিতে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ সমস্ত দায় শ্রমিকদের ওপর চাপায়। কারখানা কর্তৃপক্ষ ও হরিয়ানা সরকারের যোগসাজশে ১৪৮ জন শ্রমিককে জেলে পাঠানো হয়েছিল।

উল্লেখ্য, মারুতি মানেসার প্ল্যান্টে ১৮ জুলাই ২০১২-এর ঘটনার পর থেকে শ্রমিকদের ওপর যেভাবে দমন-পীড়ন চলেছে, তা অব্যাহত ছিল অনেকদিন। ১৮ জুলাইয়ের ঘটনার পর দুপুর ১২টায় এফআইআর দায়ের করে কর্তৃপক্ষ। পরের দিন থেকে ১৪৮ জন নিরপরাধ শ্রমিককে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে।

১৮ মার্চ ২০১৭ সালে, গুরগাঁও-এর দায়রা আদালত,  এই মামলার রায় দেয়।  যেখানে ১১৭ জন শ্রমিককে খালাস দেওয়া হয়েছিল, ১৩ জন নেতৃস্থানীয় শ্রমিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দুই সঙ্গী পবন দাহিয়া ও জিয়া লাল এ বছর হঠাৎ মারা যান।

দীর্ঘ সংগ্রামের পরও এই অন্যায় সাজাপ্রাপ্ত শ্রমিকরা কোনো আইনি স্বস্তি পাননি। উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট জামিনের আবেদন ক্রমাগত খারিজ করে দেওয়ার পর শ্রমিকদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়।

এই হতাশার মধ্যেও সমস্ত শ্রমিক একুজোট হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে যায়। এই ঐবদ্ধতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ তাঁদের নিরুৎসাহিত হতে দেয়নি। মারুতি সুজুকি মজদুর সংঘের ইউনিয়ন ও অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা এই জেলবন্দী শ্রমিকদের অনুপস্থিতিতে তাদের পরিবারের যত্ন নিয়েছে এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী অস্থায়ী কমিটির সদস্যরাও প্রতিটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

করোনা মহামারীর সময় শ্রমিকরা তাঁদের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীকে হারালেও বাকি সব শ্রমিক প্যারোলে তাঁদের পরিবারের সাথে থাকেন। ১০ বছর ধরে বিচারের আশায় থেকেছেন শ্রমিকরা। কোনো অপরাধ ছাড়াই কারখানা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের মিথ্যা অভিযোগে শ্রমিকরা সাজা ভোগ করেছেন ও করছেন।

অন্যায়ের মাঝে নতুন আশার আলো

১৮ মার্চ ২০১৭-সালে, গুরগাঁও দায়রা আদালত,  ১১৭ জন কর্মীকে মুক্তি দেয় এবং বাকি ৩১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে। এই শ্রমিকরা ১৮ জুলাই ২০১২ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন। যার মধ্যে ১৩ জন শ্রমিক কারাগারে অন্যায়ভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে থাকেন। এ সময় সাজাপ্রাপ্ত দুই শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। আর বর্তমানে মারুতির লড়াইয়ে নেতৃত্বদায়ী শ্রমিক রামবিলাস জামিন পেলেন।

এখনও বেআইনি বরখাস্ত হওয়া প্রায় আড়াই হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকের কাজ পুনরুদ্ধারের লড়াই,  বাকি দশজন শ্রমিকের জামিন ও বাকি এগারোজন শ্রমিকের মুক্তির লড়াই চালাচ্ছেন মারুতির শ্রমিকরা।

মারুতির শ্রমিকদের লড়াইয়ের বিগত প্রায় দশ বছর ধরে সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিতে পুঁজিপতি ও সরকারের জোট এবং শ্রমিকদের সংগ্রাম চলছে। বিচার বিভাগ পর্যন্ত জামিনের আবেদন নাকচ করার কারণ হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উল্লেখ করেছে। যদি মারুতির এই নির্দোষ শ্রমিকদের শাস্তি না দেওয়া হয় তাহলে নাকি বিদেশি পুঁজিপতিরা ভারতে বিনিয়োগ করতে আসবে না। তাই দোষ না করেও যাবজ্জীববন সাজা ভোগ করবে মারুতির শ্রমিকরা। এই আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা! অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাই মালিকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

সাড়ে নয় বছর ধরে কারাগারে থাকা ১০ জন শ্রমিক এখনও জামিনে রয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে, সংগ্রামের এই পর্যায়ে অন্যায়ভাবে কারাবরণকারী ১১ জন শ্রমিকের মুক্তির সংগ্রাম চলছে, অন্যদিকে চাকরিচ্যুত শ্রমিকরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

রামবিলাসের জামিন শ্রমিকদের লড়াইয়ে ছোট্ট আশার কিরণ দেখাচ্ছে। শ্রমিকদের দীর্ঘ ও লাগাতার লড়াই সমস্ত শ্রমিক পরিবারে আগামী দিনে নিশ্চয়ই আলো ছড়াবে।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on ৯ বছর অন্যায় শাস্তি ভোগের পর জামিন পেলেন মারুতির শ্রমিক নেতা রাম বিলাস

Leave A Comment