আজও স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে স্বীকৃতি পেলেন না সরকারি হাসপাতালে কাজ করা স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টরা

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 9 months by admin

30 ডিসেম্বর 2020, নিজস্ব প্রতিনিধির প্রতিবেদন

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারির একটি বিছানায় শুয়ে আছেন একজন মাঝ-বয়সী মহিলা। অ্যাসিডেন্টে পায়ের হাড় দু’টুকরো হয়ে গেছে। অন্য একজন মহিলা তাঁর গায়ের কম্বল ভালো করে জড়িয়ে দিচ্ছেন আর বলছেন, “যা শীত পড়েছে তাতে কম্বলটা ভালো করে গায়ে দিয়ে রাখো”। তারপর তাঁকে জল খাইয়ে দিলেন। তখনই একজন বললেন। “ও মাসি, একটু শোন না”। জল খাওয়াতে খাওয়াতে মহিলা উত্তর দিলেন, “যাচ্ছি”। ইনি রোগিনীর বাড়ির লোক নন। ইনি স্পেশাল অ্যান্টেনড্যান্ট। রাজ্যে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে কর্মরত আছেন প্রায় ছ’হাজার স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট। যাদের আমরা ‘আয়া’ বলে চিনি। নারী বা পুরুষ সবাই এই ‘আয়া’ নামেই পরিচিত। এঁদের অনেকে ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন। এঁদের ছুটি নেই। মাইনে নেই। পি.এফ নেই। ই.এস.আই নেই। সামাজি সুরক্ষা প্রকল্প নেই। সরকারি স্বীকৃতি নেই। তাহলে এঁদের ভবিষ্যত কী? “আমাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই, ভাই। সেই কবে থেকে কাজ করছি। রোগীদের গু – মুত ঘেঁটে চলেছি। পেশেণ্ট পার্টির কাছ থেকে যেটুকু টাকা পাই তা ঘরে নিয়ে যাই” – বললেন সুমতি ঘোষ (নাম পরিবর্তিত), কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট। তারপর বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে এই সব স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টদের সঙ্গে কথা বললাম। কেউই নাম প্রকাশ করা যাবে না এই শর্তে কথা বললেন। কারণ নাম জানতে পারলে পরের দিন থেকে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে আর কাজ পাবেন না। ‘দাদা’দের দয়ায় এঁদের কাজ পাওয়া নির্ভর করে। যখন যে শাসক দল থাকে তারই ছত্রছায়ায় থাকতে হয়। এন আর এস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট হিসাবে কাজ করেন অমল দাস (নাম পরিবর্তিত)। বাড়ি বনগার কাছে চাঁদপাড়ায়। সকাল আটটায় ডিউটি ধরার জন্য তিনি বাড়ি থেকে বেরতে হয় ভোর বেলা। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টের কাজ করছেন। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল যে বামফ্রন্টের আমলে এক সময় প্রতিটা সরকারি হাসপাতালে স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টদের জন্য একটা রেজিস্ট্রার খাতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০০০ সাল নাগাদ সেই রেজিস্ট্রার তুলে নেওয়া হয়। স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টদের হাসপাতালে ঢোকার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এস এস কে এম হাসপাতালের স্পেশাল অ্যাটেনড্যান্ট খোকন মন্ডল (নাম পরিবর্তিত) থাকেন বজবজেরর কাছে। বাড়ি থেকে হাসপাতালে আসতে দেড় – দু ঘন্টা সময় লাগে। তিনি জানালেন, “ আমরা ২০০১ সালে দাবী জানিয়েছিলাম আমাদের সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে। আমরা ধর্ণায় বসেছিলাম। তখন মমতা দি আমাদের মঞ্চে এসেছিলেন। আমাদের স্থায়ী করার দাবীও তুলেছিলেন। আজ উনি মুখ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আমরা ভেবেছিলাম উনি ক্ষমতায় এসে আমাদের স্বীকৃতি দেবেন। স্থায়ী করে দেবেন। কিন্তু কই! আমরা সেই রোগীর বাড়ির লোকের ভরসায় থাকছি। আজ বিজেপি নেতারা আমাদের সাথে কথা বলছে। তারাও বলছে আমাদের স্থায়ি করা দরকার। কাল ক্ষমতায় এলে এই কথাগুলো তারাও ভুলেই যাবে”। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের স্পেশাল অ্যাটেনড্যান্ট রমা মুহুরি (নাম পরিবর্তিত) জানালেন মাস মাইনের ঠিকা স্বাস্থ্যকর্মী নেওয়া হচ্ছে। সেখানে আমরা বাদ। আমাদের এত দিনের কাজের অভিজ্ঞতা। আমাদের তো নিতে পারত। ২০১৮ সালে একবার স্বাস্থ্য ভবন থেকে নাকি আমাদের সব নথি চেয়ে পাঠানো হয়েছিল। আমরা সুপারের কাছে সব কাগজ পত্র জমা দিলাম। তারপএ আর কোন সাড়াশব্দ নেই”।

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্পেশাল অ্যাটেনড্যান্ট হিসাবে কাজ করেন ব্রজ সাউ (নাম পরিবর্তিত)। তিনি জানালেন, “আমাদের স্পেশাল অ্যাটেনড্যান্ট হিসাবে আই কার্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা ২৪ ঘন্টা রোগীর সেবা করছি। ডাক্তার-নার্সদেরও সাহায্য করি বিভিন্ন সময়। তবুও আমরা কেউ নই!” সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী রোগীর সাথে বাড়ীর লোক থাকা বাধ্যতামূলক। কোন ‘আয়া’ বা স্পেশাল অ্যাটেনড্যান্ট রাখা যাবে না। তবুও সব হাসপাতালে স্পেশাল অ্যাটেনড্যান্ট কাজ করছেন। এন আর এস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট বাপি নস্কর (নাম পরিবর্তিত) বললেন, “ আমরা যে কাজ করছি সবাই জানে। সুপার থেকে স্বাস্থ্যভবনের কর্তারা জানেন। আমরা তো অল ওয়েস্টবেঙ্গল স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টস’ জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির তরফ থেকে ডেপুটেশন দিয়েছি স্বাস্থ্য ভবনে। আর আমরা তো অন্যায় কিছু করছি না – রোগীর সেবা করছি, তার বিনিময়ে কিছু উপার্জন করছি”। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভর্তি অহনা মুখার্জীর বাবা জানালেন যে তিনি মেয়ের জন্য স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট রেখেছেন কারণ বাড়িতে তাঁর স্ত্রী অসুস্থ। আর থাকার মতো কেউ নেই। এই ‘আয়া দিদিরা’ই তাঁ মেয়ের দেখভাল করছেন। তাঁর বক্তব্য, “সরকার প্রতিটা হাসপাতালে একটা রেজিস্ট্রার রাখতে পারে। যাদের বাড়ির থাকার কেউ নেই তাদের জন্য স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট সেই রেজিস্ট্রার অনুযায়ী রাখা যেতে পারে। স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টদের একটা মাইনে পেশেন্ট পার্টির কাছ থেকে নিতে পারে। তাতে আমাদের মতো বাড়ির পক্ষে সুবিধা হয়।লুকিয়ে চুরিয়ে স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্ট না রেখে আমরা সরাসরি রাখতে পারি। স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টরাও স্বীকৃতি পায়”।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on আজও স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে স্বীকৃতি পেলেন না সরকারি হাসপাতালে কাজ করা স্পেশাল অ্যান্টেন্ড্যান্টরা

Leave A Comment