লকডাউন চলাকালীন ভারতীয় পুঁজিপতিরা তাদের সম্পদের পরিমাণ ৩৫% বৃদ্ধি করেছে

অর্থনীতি আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 6 months by admin

বিশেষ সংবাদদাতা, ১৮ মার্চ,২০২১ :

 

মহামারী চলাকালীন মুকেশ আম্বানির আয় ছিল প্রতি ঘন্টায় ৯০ কোটি টাকা। ঠিক সেই সময়ে ভারতে প্রায় ২৪ শতাংশ লোক মাসে রোজগার করেছেন ৩০০০ টাকারও কম।

লকডাউন চলাকালীন ভারতীয় পুঁজিপতিরা তাদের সম্পদ ৩৫% বাড়িয়ে ৩ ট্রিলিয়ন (তিন লক্ষ কোটি) টাকা করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের পুঁজিপতিদের পরে র‌্যাঙ্ক করেছে। এর মধ্যে, মার্চ মাসে লকডাউনের পর শীর্ষস্থানীয় ১০০ কোটিপতির মুনাফা এতটা বেড়েছে যে  ওই টাকা ১৩ মিলিয়ন (এক কোটী ৩০ লক্ষ) দরিদ্রতম ভারতীয় জনগণের প্রত্যেককে ৯৪,০৪৫ টাকা চেক দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এই তথ্য দিয়েছে অক্সফামের “অসমতার ভাইরাস রিপোর্ট”।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড মহামারী চলাকালীন মাত্র এগারো জন শীর্ষ কোটিপতি পুঁজি-মালিকের সম্পদে সহজেই আগামী ১০ বছর ধরে এমজিএনআরইজিএ-র বাজেট বা স্বাস্থ্য খাতের বাজেট চালানো যায়। কোভিড -১৯ মহামারী বা লকডাউন এইসব পুঁজিপতিদের শুধু রক্ষা করেছে, তাই নয়, এদের মুনাফা বৃদ্ধি করেছে। উল্টোদিকে, এই সময় দারিদ্র, বেকারত্ব, অনাহার ও দরিদ্রের মৃত্যু হার বৃদ্ধি পেয়েছে।

মুকেশ আম্বানি, যিনি ভারত ও এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন, মহামারী চলাকালীন সময়ে প্রতি ঘণ্টায় ৯০ কোটি টাকা উপার্জন করেছেন। এই লকডাউনের সময়ে দেশের প্রায় ২৪% মানুষ মাসে ৩০০০ টাকারও কম উপার্জন করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র তাঁর সম্পদ বৃদ্ধির ফলে যে টাকা তিনি লাভ করেছেন সেই টাকায় ৪০ কোটি অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মচারীকে কমপক্ষে পাঁচ মাস দারিদ্র্য থেকে দূরে রাখা যেতে পারতো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে – “মহামারী চলাকালীন এক ঘণ্টায় আম্বানি যা রোজগার করেছেন , সমপরিমাণ রোজগার করতে একজন অদক্ষ শ্রমিকের দশ হাজার বছর সময় লাগবে … এবং এক সেকেন্ডে আম্বানি যা পরিমাণ টাকা লাভ করেছেন তা উপার্জন করতে একজন অদক্ষ শ্রমিকের  তিন বছর সময় লাগবে।”

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ১ শতাংশ বৃহৎ পুঁজির মালিকের সম্পদের পরিমাণ ৭০ শতাংশ গরীব মানুষের সম্পদের চারগুণ। ৩ জন ভারতীয় বৃহৎ পুঁজিপতির সম্মিলিত সম্পদ ২০১৮ – ১৯ অর্থবছরের মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের চেয়ে বেশি, যা ছিল ২৪,৪২,২০০ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে শিক্ষাগত, লিঙ্গ এবং স্বাস্থ্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যাপক অসাম্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, করোনা ভাইরাসকে রোধ করতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরিদ্রতম ২০% এর মধ্যে কেবল ৬% মানুষের নিজস্ব পায়খানা ঘর আছে। ভারতের জনসংখ্যার ৫৯.৬% মানুষ একটি ঘরে বা তার চেয়ে কম ঘরে বসবাস করে। ফলে এদের পক্ষে COVID-19 রোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানা অসম্ভব।

লকডাউনের ফলে অক্টোবরের আগেই ৩২ কোটি ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্যে ৮৪% গ্রামীণ অঞ্চলে এবং ৭০% সরকারী প্রতিষ্ঠানে পড়ত।

অক্সফাম ইন্ডিয়ার পাঁচটি রাজ্যের সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে সরকারী বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০% শিক্ষক আশঙ্কা করেছেন যে দীর্ঘকালীন স্কুল বন্ধ হওয়ার ফলে স্কুলগুলি আবার চালু হওয়ার পরে এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসতে পারবে না।  অনুমান করা হয়েছে যে স্কুলের বাইরে চলে যাওয়ার হার এক বছরে দ্বিগুণ হবে। দলিত, আদিবাসী ও মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা আরো বেশি হারে স্কুল-ছুট হয়ে যাবে। মেয়েদের বাল্যবিবাহ এবং বিবাহের পর পারিবারিক হিংসা এবং প্রথম দিকে গর্ভাবস্থার ঝুঁকিতে থাকায় তারাও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মহিলাদের বেকারত্বের হার লকডাউনের আগের ১৫%  থেকে বেড়ে পরে তা ১৮% হয়েছে। যার ফলে ভারতের জিডিপি প্রায় ৮% বা ১৫ ট্রিলিয়ন ক্ষতি হতে পারে। লকডাউনের আগে যে মহিলারা নিযুক্ত ছিলেন, লকডাউনের পরে পুরুষদের তুলনায়  তাদের ২৩.৫ শতাংশ কম নিয়োগ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশব্যাপী লকডাউনের ফলে, আমদের দেশ প্রত্যক্ষ করেছে কেবল জীবিকা অর্জনের জন্য তাদের নিজ বাড়ি থেকে অনেক দূরে বিভিন্ন রাজ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের পদব্রজে বাড়ি ফেরার এক বিশাল পদযাত্রা দেখেছিল। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, অনেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং অনেকে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কারণে প্রাণ হারান। দরিদ্র মানুষ দরিদ্রতর হয়েছেন। করোন ভাইরাস মহামারীতে এসব তীব্রতর হয়।

অক্সফাম ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী আধিকারিক অমিতাভ বেহার বলেছেন, “সুচিন্তিত ও উদ্ভাবনী উপায়ে অসমতা-দূর করার নীতি ছাড়া ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধানটি সমাধান করা যায় না, এবং খুব কম সরকারই তার প্রতি দায়বদ্ধ হয়।”

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on লকডাউন চলাকালীন ভারতীয় পুঁজিপতিরা তাদের সম্পদের পরিমাণ ৩৫% বৃদ্ধি করেছে

Leave A Comment