ফিরে ফিরে আসে সিঙ্গুর

বিভাগ-বহির্ভূত

Last Updated on 9 months by admin

28 ডিসেম্বর , 2020, নিজস্ব প্রতিনিধির প্রতিবেদন 

সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সিঙ্গুর রতনপুরের কাছাকাছি দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে ১১ একর জমির উপর একটি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই অনুযায়ী WBIDC পড়ে থাকা ঐ খাস জমিকে ঘেরার কাজও শুরু করে দিয়েছে। বর্তমান রাজ্য রাজনীতি থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহলে সিঙ্গুর নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে। CPI(M) নেতৃত্ব দাবি করেছেন যে মমতা ব্যনার্জীর এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, শিল্প নিয়ে সিঙ্গুরে তাদের পথ ঠিক ছিল।তাঁদের দাবি সেই সময়ের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাদের নেত্রী মমতা ব্যানার্জী টাটাকে সিঙ্গুর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এ রাজ্যের অসংখ্য বেকার যুবক-যুবতীর স্বপ্ন নষ্ট করে দিয়েছে।তাঁদের সুরেই বিজেপি-কংগ্রেসও দাবি করছে যে মমতা ব্যানার্জী এরাজ্যের শিল্প সম্ভবনাকে বিনষ্ট করেছেন  সিঙ্গুরে টাটা কোম্পানির ন্যানো কারখানা করতে না দিয়ে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিঙ্গুরের এক পৌঢ়, যিনি সেই সময়ের আন্দোলনকারীদের একজন, জানাচ্ছেন, “ঐ আন্দোলন মমতা শুরু করেনি।শুরু করেছিলাম, আমরা কৃষকরা।তাতে নানা দল আমাদের সমর্থনে সামিল হয়েছিলো।আমরা কোন শিল্পের বিরুদ্ধে ছিলাম না।আমরা সিপিএম সরকারের কাছে আবেদন করেছিলাম আপনারা আমাদের কৃষি জমির উপর শিল্প না করে পাশাপাশি পড়ে থাকা অন্য পতিত জমিতে করুন।কিন্তু তারা জোর করে আমাদের জমি ছিনিয়ে নিলো।”

গত শনিবার, বিশিষ্ট তরুণ নাট্যকর্মী সৌরভ পালৌধি সামাজিক মাধ্যমের একটি ভিডিওতে বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র দেবাংশু ভট্টাচার্যের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা হতে না দেওয়ার জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন।তার উত্তরে দেবাংশু ভট্টাচার্য জানান “আমাদের দল টাটা এবং তৎকালীন সরকারের কাছে শিল্পের জন্য জমি দিতে ইচ্ছুক চাষীদের ৬০০ একর জমির উপর ঐ কারখানা নির্মাণ করার প্রস্তাব দিয়েছিলো, তাতে টাটা  রাজী থাকলেও বামফ্রন্ট সরকার রাজী ছিলোনা।আমরা শিল্পের বিরোধী ছিলাম না, বলপূর্বকভাবে জমি দখলের বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলনে আমাদের দল সেইসময় অংশগ্রহণ করেছিলো।পশ্চিমবঙ্গে পড়ে থাকা জমির তো অভাব ছিলোনা, সেখানেও তো ন্যানো কারখানা হতে পারতো।আসলে শিল্প নিয়ে তাদের সদিচ্ছার অভাব ছিলো।” তিনি আরোও বলেন “মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট-ই রায় দিয়েছে যে ওই জমি-অধিগ্রহণ বেআইনি ছিলো।”

অন্যদিকে, সেইসময়ের সিঙ্গুর কৃষক আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা সংগ্রামী বামপন্থী দলগুলির বক্তব্যের মূল সুর হল –   প্রথমত টাটার ঐ ন্যানো কারখানা কয়েকবছর আগে গুজরাটে বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি অনেক শ্রমিক এখনো পর্যন্ত তাদের বকেয়া পাওনা পাননি।দ্বিতীয়ত টাটা ২০০৬ সালে তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ঘোষণা করেছিলো তার তৈরি ন্যানো কারখানায় মাত্র ৭৫০ জন লোকের কাজ হবে(টেকনিক্যাল-নন-টেকনিক্যাল সহ)।আর ঐ কারখানা সিঙ্গুরের ঐ তিনফসলী জমিতে নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে যে পরিমাণ জমি সরকার অধিগ্রহণ করে নিলো তাতে কাজ হারাতেন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে  প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার মানুষ।সিঙ্গুরের বর্তমান পরিণতির জন্য তো দায়ী বিগত বামফ্রন্ট সরকার। রাজ্যের প্রগতীশীল বুদ্ধিজীবীরা এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা এই বিষয়টা সেই সময় ধরতে পেরেছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের অত্যাচার এবং অগণিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বামপন্থার আদর্শকে কলঙ্কিত করেছে, সারা দেশের প্রগতিশীল মানুষ বহু দশক যা মনে রাখবেন।

পাশাপাশি মমতা ব্যানার্জীর সরকারের প্রতি তাদের সমালোচনাও খুব স্পষ্ট – মমতা ব্যানার্জী কৃষকদের ঐ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও এখন তাঁর জমানায় এ রাজ্যে শ্রমিক-কৃষকের অধিকারের দাবিতে কোন প্রকারের আন্দোলন বা ধর্মঘট  করা বেআইন। তিনি পুঁজিপতিদের খুশি করতে চাইছেন। তা করতে গিয়ে শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থ-বিরোধী বিজেপির মতো ফ্যাসীবাদী শক্তির উত্থানের পথকে এ রাজ্যের জন্য সুগম করে তুলছেন।  

যাইহোক, অন্যায় কৃষি বিল বিলোপের দাবিতে এই মুহুর্তে কয়েক লক্ষ কৃষক দিল্লির রাজপথে, এই প্রবল শীতকে উপেক্ষা করেও। এসবের মাঝেই ফিরে ফিরে আসে সিঙ্গুর। 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on ফিরে ফিরে আসে সিঙ্গুর

Leave A Comment