করোনা-মুক্তি: ভারতের ভ্যাক্সিন বাজার সম্পর্কে কিছু জরুরী কথা

মতামত

Last Updated on 8 months by admin

[8 জানুয়ারি 2021, 12:40AM-এ প্রকাশিত]

ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্য

আমরা যে ভাইরাসটিকে নিয়ে কথা বলছি সে ভাইরাস বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের চেনা ধ্রুপদি ডোজ-রেসপন্স সম্পর্ক (অর্থাৎ, যত কম ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করবে তত কম উপসর্গ দেখা দেবে – এই নিয়ম) মেনে চলেনা। স্বাভাবিক কথাবার্তা বলা প্রতি ১ মিনিটে ৩০০০ ১-মাইক্রন সাইজের ভাইরাস পার্টিকল বাতাসে ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে অতিমারি কালে এবং, খুব সম্ভবত, আগামীদিনেও আমাদের সুরক্ষার জন্য নাক-মুখ ঢাকা মাস্ক ব্যবহার করা সম্ভবত জীবনের অঙ্গ হতে যাচ্ছে, যার আদুরে নাম “নিউ নর্ম্যাল”। ফলে ভাইরাস এবং সামাজিক জীবন এক নতুন ঢং-এ জুড়ে গেল, যা এর আগে কখনো ঘটেনি। অর্থনীতিতেও এরকম সুদূরপ্রসারী প্রভাব অতীতে কখনো দেখা যায়নি। ভারতের জিডিপি প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রায় ২৪% সংকুচিত হয়েছে। আবার এই ভাইরাস-জনিত কারণে দীর্ঘস্থায়ী লকডাউনের মতো ঘটনার মাঝে চুপিসারে, কার্যত সংসদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে পাস কাটিয়ে নতুন কৃষি বিল, ২০২০ এবং সমধর্মী একগুচ্ছ আইন ভারত রাষ্ট্র পাস করিয়ে নিতে পারছে।

এসবকিছুর সম্মিলিত যোগফলে এ ভাইরাসকে শুধু বায়োলজির চোখ দিয়ে প্রাণী-অপ্রাণীর মাঝে অবস্থান করা একটি কণা হিসেবে দেখা যাবেনা। এর অভিঘাত বহুদূর বিস্তৃত। এমনকি এ ভাইরাসের ভ্যাক্সিনের প্রাথমিক প্রয়োগের সাথে সাথে ঊনবিংশ শতাব্দীর অ্যান্টি-ভ্যাক্সিনেশন আন্দোলনও শুরু হয়েছে আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোর বহু অংশে। এ ঘটনা কি একধরনের জাতীয়তাবাদের প্রকাশ? উত্তর জানা নেই। ল্যান্সেট-এ খবর প্রকাশিত হচ্ছে “The online antivaccine movement in the age of COVID-19” (অক্টোবর, ২০২০) শিরোনামে। অ্যান্টি-ভ্যাক্সারদের অনুগামী সংখ্যা ৭৮ লক্ষের ওপরে। এরকম সময়েই মানব ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য ফাইজারের ভ্যাক্সিন বাজারে এলো ১১ মাস সময়ে – যেখানে গড়ে একটি ভ্যাক্সিন বাজারে আসতে সময় নেয় ১০.৭ বছর। এরকম সব অদ্ভুত ঘটনার জন্মদাত্রী বা দাতা (ভাইরাসের লিঙ্গ নিয়ে নিশ্চিত নই) সার্স-কোভ-২ বা করোনাভাইরাস।

ল্যান্সেট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে (৫.০৯.২০২০) “Is India missing COVID-19 deaths?” শিরোনামে। এই প্রতিবেদনে সরকারের তরফে দেওয়া মৃত্যুর সংখ্যার তথ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। বলা হয়েছে – “জনতার তরফে চাপ এবং মিডিয়ার রিপোর্ট বিভিন্ন রাজ্যকে “কম করে দেখানো” মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে আবার ভাবতে বাধ্য করছে।” মৃত্যু ভারতবাসী এবং বিশ্ববাসীর কাছেও অজানা কোন বিষয় নয়, বরঞ্চ গা সহা হয়ে গেছে, বিশেষত সুযোগ-সুবিধে বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষদের কাছে। কিন্তু মৃত্যুরও তো রকমফের থাকে! সেরকমই এক ইতিহাস জানবো আমরা। এরকম অসহায় পরিস্থিতিতে ভ্যাক্সিন সাধারণ মানুষের কাছে বাঁচার অমৃত কুম্ভ এবং রাষ্ট্রের কাছে নতুন জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা সৃষ্টি করার হাতিয়ার হিসেবে বাজারে এসেছে।

এই মুহূর্তে ভ্যাক্সিনের ধাপগুলো যে অবস্থায় আছে – প্রিক্লিনিক্যাল – ১৯০+ ভ্যাক্সিন রয়েছে এই ধাপে, যেখানে স্বল্পসংখ্যক ভলান্টিয়ার এবং পরীক্ষাগারে প্রাণীদের ওপরে পরীক্ষার স্তরে আছে। Phase 1 – ৪৩টি ভ্যাক্সিন জনা ত্রিশেক (১০০-র কম) স্বাস্থ্যবান যুবকদের ওপরে পরীক্ষার স্তরে আছে ভ্যাক্সিনের সেফটি (নিরাপত্তা) এবং সঠিক ডোজ নির্ধারণের জন্য। Phase 2 – ২০টি ভ্যাক্সিন দ্বিতীয় স্তরে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের ওপরে (১০০০ জনও হতে পারে) প্রয়োগ করে ফলাফল দেখা হচ্ছে, যাদের মধ্যে অসুস্থতার রিস্ক বেশি এমন গ্রুপের মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। Phase 3 – ২০টি ভ্যাক্সিনকে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের (কয়েক হাজার) ওপরে প্রয়োগ করে এর কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তাকে পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। Limited – অর্থাৎ সীমায়ত স্তরে (অনুমোদিত হবার আগের ধাপ) রয়েছে ৭টি ভ্যাক্সিন। Approved – আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড মিলে অনুমোদিত ভ্যাক্সিনের সংখ্যা ৩টি। এগুলো হল (১) ফাইজার এবং বায়োএনটেক কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি mRNA ভ্যাক্সিন, মডার্নার তৈরি mRNA-1273 ভ্যাক্সিন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাক্সিন। এছাড়াও চিনে তৈরি Sinopharm এবং Sinovac ভ্যাক্সিন চিন, সংযুক্ত আরব আমীর শাহি, বাহারাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং আর্জেনটিনায় ব্যবহারের ছাড়পত্র পেয়েছে। Abandoned – ভ্যাক্সিন তৈরির মাঝপথে পরিত্যক্ত হয়েছে ১টি ভ্যাক্সিন। অস্ট্রেলিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয় এই ভ্যাক্সিন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। (তথ্যসূত্রঃ “Coronavirus Vaccine Tracker”, New York Times, 5.01.2021)

প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, বিশ্ববন্দিত জার্নাল সায়ান্সএর প্রথম দিকের একটি খবর হচ্ছে “Unveiling ‘Warp Speed,’ the White House’s America-first push for a coronavirus vaccine” (১২.০৫.২০২০)। অর্থাৎ, ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউজ যে বিকারগ্রস্ত গতি (Warp Speed) দেখাচ্ছে তা আমেরিকাপ্রথম (America-First) এই মন্ত্র নিয়ে করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন তৈরি হবে। এ লেখাতে পরে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে – “আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করে – এবং চিনের যে কোন ধরনের ভ্যাক্সিন পরিহার করে – আমেরিকা আশা করছে জানুয়ারি ২০২১-এর মধ্যে ৩ কোটি প্রমাণিত ভ্যাক্সিন তৈরি করে ফেলতে পারবে যেগুলো সবই আমেরিকানদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।” সহজ কথা, ভ্যাক্সিনের সুফল ভোগ করবে কেবলমাত্র আমেরিকা। আরও বলা হয়েছে – “Operation Warp Speed” এর মধ্যেই ১৪টি ভ্যাক্সিন ক্যান্ডিডেটের মধ্যে এর কার্যক্রমকে সীমায়িত করেছে এবং পরিকল্পনা রয়েছে ৮টি ভ্যাক্সিনকে নিয়ে জোর কদমে এগোবে।” রয়টার্স সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী (১৪.০৭.২০২০) – “Warp Speed initiative aims for COVID-19 vaccine production within 6 weeks”এই Operation Warp Speed (OWS)-এর সুবাদেই অক্সফোর্ড ভ্যাক্সিনের  ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া-র সাথে ১০ কোটি ভ্যাক্সিনের ডোজের ব্যবস্থা হয়েছে। NEJM-এ “Developng Safe and Effective Covid Vaccines – Operation Warp Speed’s Strategy and Approach” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন (২৬.০৮.২০২০) প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনের সর্বশেষ মন্তব্য – “কোন বৈজ্ঞানিক উদ্যোগই ২০২১-এর জানুয়ারির মধ্যে সাফল্যের গ্যারান্টি দিতে পারেনা, কিন্তু যে স্ট্র্যাটেজিক সিদ্ধান্ত এবং পছন্দ আমরা বেছে নিয়েছি, সরকার আমাদের যে সমর্থন জুগিয়েছে, এবং আমরা আজ অবধি যতদূর সাফল্য অর্জন করেছি তাতে আমরা আশাবাদী হতে পারি আমরা এই অভূতপূর্ব উদ্যোগে সফল হবো।”

পরবর্তীতে (২৬.১১.২০২০) নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো প্রভাবশালী পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো – “Politics, Science and the Remarkable Race for a Coronavirus Vaccine”। রাজনীতি ও বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার জন্য শিরোনামটিই যথেষ্ট। এ প্রতিবেদনে Operation Warp Speed-এর সাফল্যের জন্য তিনটি প্রধান কারণের কথা বলা হয়েছে – (১) ভ্যাক্সিন তৈরির নতুন পদ্ধতি বিজ্ঞানীদের হাতে সার্স-কোভ-১ মহামারির সময় থেকে বাস্তবে পরীক্ষিত  হবার অপেক্ষায় ছিল, (২) আকাশ-ছোঁয়া সংক্রমণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিল, এবং (৩) সরকার প্রস্তুত ছিল প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে এবং আমলাতন্ত্রের লাল ফিতের বাঁধন আলগা করার জন্য। এর ফলে এমনকি ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল শেষ হবার আগেই বিপুলহারে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রইলনা।

কিন্তু কোটি কোটি মানুষের জীবনের প্রশ্ন যেখানে জড়িয়ে আছে সেখানে “শর্টকাট”-এর কোন প্রসঙ্গ আসতে পারেনা। মেডিক্যালইন্ডাস্ট্রিয়ালস্টেটপলিটিক্স কমপ্লেক্সের একটি ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় এই প্রতিবেদনে। “Operation Warp Speed”-এর প্রধান দায়িত্বে দুজন – বিজ্ঞানের অংশে রয়েছেন একজন বিজ্ঞানী এবং লজিস্টিকের দায়িত্বে মিলিটারির চারতারা জেনারেল গুস্তাভ এফ পার্না

Operation Warp Speed (OWS)-এর মূল বিষয়টি কি? “যেভাবে ট্র্যাডিশন অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে ভ্যাক্সিন তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, সে পদ্ধতিগুলোকে বাতিল করার বদলে বিভিন্ন ধাপ সমান্তরালভাবে চলবে – যেমন, বাণিজ্যিকভাবে ভ্যাক্সিনের উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে এর কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নির্দিষ্টভাবে প্রমাণের বেশ আগেই। এতে আর্থিক ঝুঁকি বাড়ে, উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়েনা।” অর্থাৎ, যে যে ধাপে সাধারণভাবে ভ্যাক্সিন তৈরি হয় এখানে সেগুলো বাতিল করা হচ্ছেনা। একইসাথে একাধিক ধাপের কাজ সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু তৈরি ভ্যাক্সিনের নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের নিরসন হলনা।

নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন (NEJM)-এর মতো জার্নালে ভ্যাক্সিন তৈরির নতুন পথ-পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়ে সম্পাদকীয় হল – “The Covid-19 Vaccine-Development Multiverse” (১৪.০৭.২০২০) এই সম্পাদকীয়তে বলা হল – “কোভিড১৯কে প্রতিরোধ করার জন্য একটি ভ্যাক্সিনের জরুরী প্রয়োজন এবং এর পরিণতিতে এই রোগের ছড়িয়ে পড়ার ফলে যত মৃত্যু ঘটছে এবং শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে তাকে আটকানো যাবে” বলা হল – “অনেক সংখ্যক ফেজ ৩ ট্রায়াল ব্যর্থ হয় কারণ নিরাপত্তা (safety) এবং কার্যকারিতা (efficacy)-র সবচেয়ে ভালোভাবে সুসামঞ্জস্য রক্ষা করতে যে ডোজের প্রয়োজন সেটা করতে ভুল হয়। mRNA vaccine নিয়ে সঠিক ডোজ নির্ধারণ করার কাজ এখনো চলছে।” তাহলে এখনো খুব নিশ্চিত অবস্থানে আমরা নেই। বৈপ্লবিক গতিতে করোনা ভ্যাক্সিনের প্রস্তুতি চলছে – ৬ বছরের সময় সীমাকে ৬ মাসে নামিয়ে আনার পরেও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আমরা নেই। সম্পাদকীয়তে আরও বলা হল – “পৃথিবী এখন দেখেছে ৬ বছরের কাজকে সঙ্কুচিত করে ৬ মাস করা হয়েছে। ভ্যাক্সিনের বহুস্তরীয় পদ্ধতি (vaccine multiverse) এটা আবার করতে পারবে, যাতে বাস্তবক্ষেত্রে নিরাপদ, কার্যকরী কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিন আগামী ৬ মাসে এর লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে?”

এই সম্পাদকীয়তেই জানানো হল সার্সকোভএর প্রথম জেনোমিক সিকোয়েন্স প্রকাশ করা থেকে ফেজ পর্যন্ত আসতে মাস লেগেছে, যেখানে স্বাভাবিক নিয়মে লাগে থেকে বছর।” সহজ কথা হল, জানুয়ারি, ২০২০-তে সার্স-কোভ-২-এর জেনোমিক সিকোয়েন্স বিজ্ঞানীদের হাতে আসার পরে ফেজ ১ ট্রায়াল শুরু হয়েছে ৬ মাসের মধ্যে যেখানে প্রচলিত পথে এ সময় লাগার কথা ৩ থেকে ৯ বছর।

অতিমারির জীবন-মরণ সমস্যার ক্ষণে সময়ের পরিমাপকে সংকুচিত ও জমাট বাঁধিয়ে দেওয়া হচ্ছে (condensed, coalesced and overlapped)। এতে সময় সংক্ষেপ হচ্ছে। এর ফলে রোগীর নিরাপত্তা, ভ্যাক্সিন নিরাপদ কিনা এগুলো যেমন বিবেচ্য তেমনই বিবেচ্য ভ্যাক্সিনটি নির্ভরযোগ্য নৈতিকতার এবং বৈজ্ঞানিক কঠোর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গেল কিনা, এ পরীক্ষাগুলোয় পাস করল কিনা এগুলোও বিশেষ বিবেচ্য বিষয়।

অবশ্য বৈজ্ঞানিকদের পুর্ব-লব্ধ জ্ঞান এক্ষেত্রে বিশেষ কাজে লেগেছে। সেগুলো হল – (১) করোনা ভাইরাসের দেহের স্পাইক প্রোটিনের ভূমিকা সম্বন্ধে আগাম ধারণা থাকা, (২) ইমিউনিটির ক্ষেত্রে স্পাইক প্রোটিন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে “নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি”-র ভূমিকা, (৩) নিউক্লিক অ্যাসিড (যেমন আরএনএ বা ডিএনএ) ভ্যাক্সিন প্ল্যাটফর্মের উন্নত চেহারায় বিবর্তন এবং (৪) ভ্যাক্সিন তৈরির প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে (sequentially) করার পরিবর্তে সমান্তরাল ভাবে (parallel) করা, কিন্তু যারা ভ্যাক্সিন স্টাডিতে অংশগ্রহণ করেছে তাদের ক্ষেত্রে কোন ঝুঁকি না নিয়ে। পূর্বোল্লেখিত সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে – “কার্যকারিতা কেবলমাত্র তখনই নির্ধারণ করা যাবে যখন যাদেরকে ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে এবং অতিমারির হটস্পটের মধ্যে তুল্যমূল্য বিচার (match) করা যায় … এজন্য প্রাথমিক এন্ড পয়েন্টগুলোকে সতর্কতার সাথে নির্বাচন করতে হবে (এ বিষয়ে এর আগে বিস্তারিত আলোচনা করেছি), নির্বাচন করতে হবে স্টাডি-ডিজাইন এবং স্যাম্পেল সাইজের (অর্থাৎ কতজনের ওপরে ট্রায়াল দেওয়া হবে) সম্ভাব্যতার পুনর্মূল্যায়ন বিবেচনায় রাখতে হবে।”

 

 

সবমিলিয়ে কয়েক’শ কোটি ভ্যাক্সিন তৈরির লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যাচ্ছেন। এখানে মনে রাখতে হবে “The race for a vaccine moves fast, as the need for a solution is evident, but we cannot forget that safety is of the highest importance.” তার সাথে এটাও মনে রাখতে হবে শুধু নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি নয়, আমাদের শরীরের T-cell-কে ভ্যাক্সিন কতটা সক্রিয় করে তুলতে পারছে সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ক্ষেত্রে T-cell-এর ভূমিকা  (CD4 and CD8) অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নেচার-এর একটি প্রতিবেদনে (“Coronavirus vaccines leap through safety trials — but which will work is anybody’s guess” – ২১.০৭.২০২০) বলা হয়েছে – “যদি একটি ভ্যাক্সিন একইসাথে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে এবং দুধরনের টি সেলকে উদ্দীপিত করতে পারে তাহলে রোগের বিরুদ্ধে এর লড়াই অনেক শক্তিশালী হবে যখন efficacy trials (কার্যকারিতার পরীক্ষা) এদের প্রথম ফলাফল জানাবে তখন বোঝা যাবে ভ্যাক্সিনে তৈরি ইমিউন প্রতিক্রিয়ার প্রকৃত চরিত্র – কোভিড-১৯এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে কি পারছে না।” বিজ্ঞানীদের এখনো অজানা ঠিক কত পরিমাণ (what levels) অ্যান্টিবডি প্রয়োজন দেহে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার জন্য।

আমাদের একমাত্র আশা ভ্যাক্সিনের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকার পাশাপাশি এ সতর্কবাণীগুলোও মাথায় রাখতে হবে আমাদের। এর সাথে মনে রাখা দরকার ভ্যাক্সিন হল জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একধরনের ইন্টারভেনশন, কোন পণ্য নয়। ভ্যাক্সিন তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে অভাবিতপূর্ব ৫ বিলিয়ন ডলার পাব্লিক ফান্ড বিভিন্ন সরকারের তরফে বিনিয়োগ করা হয়েছে। মডার্না, ফাইজার এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা প্রাথমিকভাবে এদের ফেজ ৩ ট্রায়ালের রিপোর্ট প্রকাশ করতে চায়নি। গণদাবীতে এ রিপোর্ট প্রকাশ করে (Els Torreele, “Business-as-Usual will not Deliver the COVID-19 Vaccines We Need”, Development, 9.11.2020)। ভ্যাক্সিন নিয়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি অসুবিধে আছে। বিভিন্ন টেকনোলজি বা ওষুধের ক্ষেত্রে যে আকাশ ছোঁয়া মুনাফা করা যায় ভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রে বহুজাতিক দৈত্যরা সে পরিমাণ মুনাফা করতে পারেনা। এজন্য ভ্যাক্সিন তৈরির ক্ষেত্রে এদের আগ্রহ কম থাকে। কিন্তু কোভিড অতিমারি একেবারে অভূতপূর্ব এক ঐতিহাসিক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এজন্য এক্ষেত্রে ভ্যাক্সিন তৈরির ক্ষেত্রে যে ঘাড়-ভাঙ্গা দৌড় ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে সে ঘটনাও মানব ইতিহাসে প্রথমবার ঘটলো।

এখানে প্রশন উঠবে ভারতে অনুমোদিত দুটি ভ্যাক্সিন নিয়ে – (১) সিরাম ইন্সটিটিউট-এ তৈরি অক্সফোর্ড ভ্যাক্সিন কোভিশিল্ড, এবং (২) ভারত বায়োটেক-এর তৈরি কোভয়াক্সিন। প্রথমটির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ট্রায়াল এবং বিভিন্ন ধাপে কঠোরভাবে পরীক্ষিত হলেও ভ্রতে ট্রায়াল হয়নি। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে না হয়েছে কোন যথোপযুক্ত ধাপেধাপে ট্রায়াল, না প্রকাশিত হয়েছে ট্রায়াল রিপোর্ট, না প্রকাশিত হয়েছে কোন মান্য আন্তর্জাতিক জার্নালে, না হয়েছে এর peer review। রোগীদের ওপরে এর প্রয়োগ শুরু হয়েছে। সর্বভারতীয় স্তরে ভারতবাসীর ওপরে প্রয়োগের প্রস্তুতি। এক অদ্ভুত শব্দবন্ধ ব্যবহার এই ভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রে – “clinical trial mode”। বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং গবেষকদের কাছে অজানা এই “clinical trial mode” বলতে কি বোঝায়। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে (৪.০১.২০২১) “India Approves Oxford-AsraZeneca Covid-19 Vaccine and 1 Other”। সে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে – “Criticism about the lack of clarity on the data that the regulator examined came swiftly after the two vaccines were authorized for emergency use. All India Drug Action Network, a public health watchdog, immediately issued a statement requesting more information about the scope of clinical trials and dosing regimens for both vaccines. On the Bharat Biotech vaccine, called Covaxin, the group said it was “baffled to understand what scientific logic has motivated the top experts” to authorize a vaccine still in clinical trials.” প্রকট হয়ে উঠছে সরকারের তরফে স্বচ্ছতা এবং জনসমাজের তরফে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসের অভাব। যে দেশগুলো সাফল্য অর্জন করেছে (বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড) সেসব দেশে এই পারস্পরিক স্বচ্ছতা বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে কাজ করেছে।

নেচার-এর মতো পত্রিকায় (১৩.০৮.২০২০) বিশেষ প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে “এইডস, ম্যালেরিয়া অ্যন্ড টিউবারকিউলোসিস আর সার্জিং”, অর্থাৎ এইডস, ম্যালেরিয়া এবং টিউবারকিউলোসিস প্রবল গতিতে বাড়ছে। এখানে এখনো অব্দি করোনা-প্রতিরোধী ভ্যাক্সিনের হিসেব দেওয়া যায়। কিন্তু শুধু ভ্যাক্সিন এর উত্তর নয়। বিপরীতে, ভ্যাক্সিন কুহকী আত্মসন্তোষের জন্ম দিতে পারে – মাস্কের ব্যবহার, ব্যক্তিগত/সামাজিক দূরত্ব বিধি, হাঁচি-কাশির ক্ষেত্রে সতর্কতা শিকেয় উঠে যেতে পারে। তখন সামাজিকভাবে আরেক দুর্দৈবের সম্মুখীন হবো আমরা। মনে রাখা দরকার, এই ভাইরাস চলে যাবার জন্য আসেনি। এর জ্ঞাতিগুষ্টিরা অপেক্ষা করে আছে মানুষের শরীরে প্রবেশের জন্য, এবং সবাই সম্ভাব্য সংক্রমণের শিকার হয়ে আছে। নেচার-এর আলোচিত প্রবন্ধের পর্যবেক্ষণে – “তিন মাসের বেশি সময় ধরে লকডাউন অসংখ্য মানুষকে নন-কোভিড বা কোভিড নয় এমন রোগীরা সাধারণ চিকিৎসার কাছে পৌঁছুতে পারেনি, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একইসাথে নতুন রোগীদের উপসর্গ চিহ্নিতই হয়নি। ফলে চিকিৎসার প্রসঙ্গ আসেনা।” এদের হিসেবে চিন, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে ২০২০ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে ২০০,০০০ অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটবে, সাব-সাহারা আফ্রিকায় ২০২০-তে ৭৭৯,০০০ জন মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে।” ল্যান্সেট-এ প্রকাশিত “Has COVID-19 subverted global health” প্রবন্ধে (৩০.০৫.২০২০) রিচার্ড হর্টন বলছেন – “দীর্ঘকালীন এবং সর্বব্যাপী লকডাউনের পলিসি এবং উচ্চ-প্রযুক্তির স্বাস্থ্য পরিষেবার উপরে জোর অনিচ্ছাকৃতভাবে আরও বেশি অসুস্থতা এবং মৃত্যুর জন্ম দিতে পারে, বিষমভাবে দরিদ্রদের ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

হ্যাঁ, পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন যেখানে জড়িয়ে আছে সেখানে নিরাপত্তা, গুণমান এবং কার্যকারিতার প্রসঙ্গে কোন আপোষ চলতে পারেনা। চলতে পারেনা তথ্যের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, অসম্পূর্ণতা এবং মিথ্যাচার।

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
7 Thoughts on করোনা-মুক্তি: ভারতের ভ্যাক্সিন বাজার সম্পর্কে কিছু জরুরী কথা
    Soumya Chakraborty
    8 Jan 2021
    11:50am

    Very informative sir. Good one.

    0
    0
    Jayati Talapatra
    8 Jan 2021
    12:18pm

    Self protection is a best way to prevent virus attacks.

    0
    0
    Partha Dey
    8 Jan 2021
    2:57pm

    Onek ojana tathyo janlam…..sob bujhlam bolte parbo na tobe apnar suchintito lekha kichuta holeo dhoyasha katalo

    0
    0
    Rational Medicine
    9 Jan 2021
    5:06pm

    করোনা টীকা-পরিস্থিতির এবং তৎসংক্রান্ত যুক্তিনিষ্ঠ প্রশ্নসমূহের এক চমৎকার উপস্থাপনা। বাংলাভাষায় এই আলোচনাকে নিয়ে আসার জন্য লেখক এবং সম্পাদকদের অভিনন্দন।

    0
    0
    Sujoy chanda
    9 Jan 2021
    7:39pm

    খুব সুন্দর। তথ্য বহুল লেখা।

    0
    0
    রঞ্জন দাস
    11 Jan 2021
    2:06pm

    অসাধরন লেখা যেখানে করোনা ভ্যাক্সিন নিয়ে আলোচনা করলেও আন্তর্জাতিক ভাবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অন্তত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন স্যার। এতো গভীর লেখা উপস্থাপনার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

    0
    0
    Soumya Chakraborty
    15 Jan 2021
    5:17pm

    Excellent one sir

    0
    0

Leave A Comment