বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের প্রাক্কালে কিছু জরুরী কথা

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 4 weeks by admin

বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের প্রাক্কালে কিছু জরুরী কথা

অনিমেষ দত্ত

 

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করলেও অনেক সময় মাছ এতটাই ছটফট করে যে তাকে ঢাকার জন্য শাক যথেষ্ট হয় না। আর মাছটা যদি হয় জলবায়ু, তাহলে তো কথাই নেই! ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বা ক্লাইমেট চেঞ্জ এখন বিশ্বের রাজনীতিতে পরিচিত শব্দ। আর জলবায়ুর পরিবর্তনকে ঢেকে রাখার বা আড়াল করার মতো সাধ্য-শক্তি এখনও মানুষের হয়নি। তাই সময় যত এগোচ্ছে প্রতিটা মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তন এর সমস্যা আরও দৃশ্যত হয়ে উঠেছে। আর জলবায়ু পরিবর্তন এমনই একটি বিষয় যা কোনো দেশের সীমারেখা মানে না। এ প্রবন্ধে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু রাজনীতি ও বিশ্বব্যাপী চলমান জলবায়ু আন্দোলন নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

দ্য ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ, (আইপিসিসি)-র সদ্য প্রকাশিত ষষ্ঠ রিপোর্ট দেখে অনেকেরই রাতের ঘুম উড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। রাষ্ট্রনেতারা অনেক কষ্টে, আন্দোলনের চাপেই হোক কিংবা বিজ্ঞানী-পরিবেশবিদদের কনসার্নের ফলেই হোক, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’, ‘বিশ্ব উষ্ণায়ণ’ এগুলি সত্যি ঘটনা। আর এর প্রভাব সুদূর প্রসারী। প্রথমে খানিক কথা বলে নেওয়া দরকার সদ্য প্রকাশিত আইপিসিসি রিপোর্ট কি বলছে।

এই আইপিসিসি হলো রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যানেল। ২০১৩ সালে আইপিসিসি-র পঞ্চম রিপোর্ট বেরিয়েছিল এবং ২০১৮-১৯’এ একটি ‘স্পেশাল রিপোর্ট’ প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই দুই রিপোর্টের মূলকথা এবং আরো নতুন তথ্য-অনুসন্ধান করে তার সমন্বয় ঘটিয়ে ২০২১-এর রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্টে উল্লিখিত কিছু ‘ভয়’ পাইয়ে দেওয়া  তথ্য দেওয়া যাক- (১) ২০১৯ সালে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা গত ২০ লক্ষ বছরের মধ্যে সব থেকে বেশি। (২) মিথেন এবং নাইট্রাস-অক্সাইডের মাত্রা গত ৮ লক্ষ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। (৩) পৃথিবীর হিমবাহগুলি গলছে। গলন বৃদ্ধির সময়কাল হিসেবে রিপোর্টে উঠে এসেছে ১৯৯০ সাল পরবর্তী সময়। অর্থাৎ যখন নয়াউদারবাদের সূচনা ঘটে গেছে। (৪) ২০১১-২০ এই সময়পর্বের মধ্যে সুমেরু সাগরে বরফের ঘনত্ব সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। বর্তমানে সুমেরু সাগরের বরফাবৃত স্থান শেষ গ্রীষ্মে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছচ্ছে, গত হাজার বছরে এ ঘটনা দেখা যায়নি। (৫) কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর পরিমাণ বাতাসে হুহু করে বেড়েছে গত কয়েক বছরে। (৬) পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা দেশের উপকূল এলাকায় আমরা জানি গত কয়েক বছরে কি পরিমাণে সাইক্লোনগুলির সংখ্যা শেষ চার দশকে লাগামছাড়া ভাবে বেড়ে গেছে। এবং তাদের চরিত্রগত কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যার ফলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে প্রাকৃতিক কারণে এই বদল ঘটেনি। আর রিপোর্টও বলছে এর বেশিরভাগটাই মনুষ্যসৃষ্ট। (৬) বৃষ্টিপাতের ব্যাপক বৃদ্ধি গত কয়েক দশক ধরে ঘটে চলেছে।

উপরের কথাগুলি ছাড়াও রিপোর্টে আরও ভয় পাইয়ে দেওয়া কথাবার্তা আছে। সেসব আলোচনা আপাতত বাদ দিলাম। কিন্তু যদি আইপিসিসি রিপোর্টকে ভালো করে যদি পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে এটা স্পষ্ট যে মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে আজ অবধি গোটা বিশ্বের জলবায়ুর এই বিরাট বিরাট বদলগুলো হতে হতে গেছে। কেউ কেউ এও বলছেন যে যতটা ক্ষতি হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই তা হাতের বাইরে চলে গেছে। ব্যাপক হারে অরণ্য ধ্বংস, শুধুমাত্র মুনাফার তাগিদে শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক লুণ্ঠন যার ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া এই সমস্ত কারণকেই জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে রিপোর্টে। আর সেই নিয়েই রাষ্ট্রনেতাদের মাথায় হাতও পড়েছে। এই এতোবড়ো সমস্যার সমাধান কীভাবে? সেই নিয়েই এই বছরের নভেম্বর মাসে গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে COP26 (UNITED NATIONS CLIMATE CHANGE CONFERENCE) নামক সম্মেলন। সারা বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা সেই সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করবেন। আর সেই COP26 এ যাতে কোনো একটা সমাধানসূত্র বেরোয় তার জন্য ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্বব্যাপী শুরু হয়ে গেছে আন্দোলন। রাষ্ট্রনেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই আগামী ২৪শে সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। যার আঁচ এসে পড়েছে ভারতেও। অন্যান্য শহরের মতোই কলকাতাতেও বিভিন্ন গণসংগঠন, পরিবেশপ্রেমীদের উদ্যোগে ২৪ তারিখ বেলা ১১টায় জলবায়ু ধর্মঘট সফল করতে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এই ডাক দিয়েছে গত তিন বছর ধরে চলা পরিচিত আন্দোলন “গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক”। ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামে যে আন্দোলন সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গের হাত ধরে শুরু হয়েছিল তা আজ ব্যাপক জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছে।

কী করে তৈরি হয়েছিল এই আন্দোলন?

২০১৮ সালের এইরকমই সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের ১৭ বছর বয়সী গ্রেটা থুনবার্গ ও তার বন্ধুরা মিলে প্রতি শুক্রবার স্কুল বন্ধ করে সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে থাকত। বেশকিছু দিন পর ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরপর ছাত্রছাত্রীদের সাথে এসে যোগ দেন সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ। সময়ের নিরিখে এই আন্দোলন অভিনবত্ব অর্জন করে। প্রত্যেকটি প্ল্যাকার্ডে থাকত জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন এমিশন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রারিক্ত ব্যবহারের বিরূদ্ধে জোরালো স্লোগান। এখানে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেই বছরেই শীতপ্রধান দেশ সুইডেনে ঘটে যায় ব্যাপক তাপপ্রবাহ এবং দাবানল যা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা মনুষ্যজাতির অস্তিত্বকেই। আন্দোলনের দিন হিসেবে শুক্রবারকেই বেছে নেওয়ার পিছনের কারণ ছিল ২০১৭ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) ডোমিনিকা, সেন্ট ক্রোয়েক্স, পুয়েত্রো রিকো ইত্যাদি দ্বীপপুঞ্জগুলোর বুকে আছড়ে পড়া হারিকেন ‘মারিয়া’, যার ফলে চার হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। প্রত্যেকটা আন্দোলনের ক্ষেত্রেই দেখা যাবে এরকম কিছু ঘটনার কথা, যেগুলো দেশলাই কাঠির কাজ করে। এক্ষেত্রেও একই।

এরপর জল গড়ায় অনেক দূর। গ্রেটা সুইডেনের গন্ডি পেরিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ইন্টারন্যাশনাল ‘আইকন’। পরিবেশ আন্দোলনের নতুন দিশা দেখানো এক স্বর। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের (বিশেষত ছাত্রছাত্রীরা) মানুষ এই বাচ্চা মেয়েটির লড়াইকে নিজের লড়াই হিসেবে দেখতে শুরু করেন। আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গোটা বিশ্বব্যাপী “ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার” আন্দোলনের নেটওয়ার্ক। যে আন্দোলনের মুখ গ্রেটা থুনবার্গ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২০-২৭ তারিখ এই সপ্তাহে গোটা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয় সফল জলবায়ু ধর্মঘট। রাস্তায় নামে হাজার হাজার মানুষ। এই ঢেউ প্রথম বিশ্বের দেশে বেশি লক্ষণীয়। আমাদের ভারতেও এই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পরে। দিল্লি, কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, আসাম, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর সহ ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর এলাকায় রাস্তায় নামেন কয়েকশো ছাত্রছাত্রী, সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা। ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামটার সাথে সাযুজ্য রেখে গড়ে উঠতে থাকে সমাজের বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত মানুষদের নেটওয়ার্ক “টিচার্স ফর ফিউচার”, অ্যাডভোকেটস ফর ফিউচার”, ” গারডিয়ান্স ফর ফিউচার”, “ইউথ ফর ক্লাইমেট” ইত্যাদি। যাদের সবারই মূল কথা হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ সংকটে, ফলে সেই আসন্ন সংকট থেকে মুক্তির কোনো দিশা দেখানো তো দূরে থাক, রাষ্ট্রনেতাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টার গুরুত্বই প্রায় নেই। এখানেই বিশ্ব রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গ্রেটা থুনবার্গ।

২০১৯ সালে, নিউ ইয়র্ক সিটিতে হওয়া ইউ.এন ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে গ্রেটা থুনবার্গ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বিশ্বের তামাম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মুখে দৃপ্তকণ্ঠে প্রশ্ন করে বলে, “How dare you pretend that this can be solved with just ‘business as usual’ and some technical solutions? With today’s emissions levels, that remaining CO2 budget will be entirely gone within less than 8 and 1/2 years. (কোন সাহসে আপনারা ভান করছেন যে ” স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা” চালিয়ে গেলেই আর কিছু প্রযুক্তিগত সমাধান করলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আজকে যে হারে নির্গমন হচ্ছে, তাতে বাকি থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের চরম সীমা সামনের সাড়ে আট বছরের মধ্যেই অতিক্রান্ত হয়ে যাবে।”)”

এরপর ২০২০ সালে কোভিড অতিমারীর ফলে গোটা বিশ্বের ‘স্বাভাবিকত্ব’ ঘেটে ঘ হয়ে যায়। কিন্তু পুঁজিবাদের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে মুনাফার বৃদ্ধি বাড়িয়ে যেতে হবে, নাহলে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। আর সেই কোভিডকালেই দেখা গেল পুঁজিবাদের নব্যরূপ নয়া উদারবাদী – বিশ্বায়নের ফরমুলায় কোভিডের সময়েও মুনাফা করে যাচ্ছে। ব্যাপক হারে ডিজিটালাইজেশন বর্তমান সময়ের ক্যাপিটালিজম এর অন্যতম মুনাফার জায়গা। আর সেটাই ঘটল। ক্লাসরুম বন্ধ। ফলে বাস্তব ক্লাস ছেড়ে গুগুল মিট, জুমের মতো কোম্পানিরা ফুলে ফেঁপে উঠল। সিনেমা হল বন্ধ। তাতে কি? ইতিমধ্যেই কোভিডের আগে বাজারে এসে গেছিল নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, ডিজনি+হটস্টার ইত্যাদি ওটিটি মাধ্যম। মানুষের সামাজিক সম্পর্ক গুলো গেল ঘেটে। যার ফলে আরও আরও একাধিক সমস্যা তৈরি হতে লাগলো – সামাজিক, মানসিক, শারীরিক অর্থনৈতিক।  কিন্তু যে দিকটা একেবারেই অবহেলিত থাকল সেটা হচ্ছে যে এই সমস্ত বিগ ডেটা কোম্পানিগুলির ব্যাপক মুনাফার পিছনে থাকা ব্যাপক হারে জীবাস্ম জ্বালানির ব্যবহার। শক্তির ব্যাপক জোগান না থাকলে এই প্ল্যাটফর্ম গুলো চালানো অসম্ভব। শক্তির লাগামছাড়া উৎপাদন বৃদ্ধি হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই, কোভিডের পর আরও বেড়ে গেল। আর এই মুহূর্তে বিগ ডেটা কোম্পানিগুলি যে পর্যায়ে এই নতুন ব্যবস্থাকে নিয়ে গেছে বা যেতে চাইছে তাতে করে আগামীদিনে জীবাস্ম জ্বালানির প্রয়োজন আরও বেড়ে চলেছে। আর সেখানেই এসে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক লুণ্ঠনের গল্প। কার্বন নির্গমনের গল্প।  বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান গবেষণার তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব অরণ্য, নদী ব্যবহার হচ্ছে শক্তির এই ‘প্রয়োজনীয়’ চাহিদা মেটাতে। কার্বন রেটিং কার কত, সেই নিয়েই শুরু হয়ে গেছে ব্যবসা। কার্বন বাণিজ্য, আজকের অন্যতম মুনাফার জায়গা। আমাদের ভারতে মোদি সরকারের আমলে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে একের পর এক অরণ্যাঞ্চল বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বড়ো কর্পোরেটদের হাতে। অরুণাচল প্রদেশের দিবাং ভ্যালি, আসামের এলিফ্যান্ট রিজার্ভ অরণ্য দেহিং পাটকাই, নিয়মগিরিতে আদানির প্রোজেক্ট, গোয়ায় মোল্লেমে বানিজ্যিক কারণে জঙ্গল সাফ করে রাস্তা সম্প্রসারণ ইত্যাদি। এই সবকিছু যাতে আইন মোতাবেক হয়, কোনো কর্পোরেটকে যাতে আইনী সমস্যার মধ্যে না জড়াতে হয় ও অবাধে তারা প্রাকৃতিক সম্পদ লূঠ করতে পারে তাই ২০০৩ সালের এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (EIA) আইনকে ২০২০ সালে সংশোধন করা হয়েছে। যাতে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে, তাদের প্রোজেক্ট-এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো ক্ষতি হলে তার দায় নেবে না সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। ফলে পরিবেশের উপর, মানবাধিকারের উপর ফ্যাসিস্ট আক্রমণ চলছে জোরকদমে। এইধরনের আইনী বদল শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের যে যে দেশে এই মুহূর্তে ফ্যাসিস্ট সরকার রয়েছে সমস্ত জায়গাতেই প্রকৃতি লুন্ঠনের প্রোজেক্ট রমরমিয়ে চলছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে বলসোনারোর ব্রাজিল, আমাজন ধ্বংস। আবার এর সাথেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে এই কর্পোরেট রাজের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন। মূলত সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিশ্বের আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষেরাই সামনে থেকে লড়াই করছেন রাষ্ট্র ও ক্যাপিটালিজম এর জোড়া আক্রমণের বিরুদ্ধে। শহীদ হয়েছেন অনেকেই। ভারতে ইউ.এ.পি.এ এর মতো কালা আইনে গ্রেফতার করা হচ্ছে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের। গতবছরই Draft EIA-2020 বাতিলের দাবীতে আন্দোলন হয় গোটা ভারতে। সেই আন্দোলনেরই একজন কর্মী দিশা রাভিকে পুলিশ গ্রেফতার করে “টুলকিট” শেয়ার করার ‘অপরাধে’। কিন্তু তাও প্রতিরোধ চলছে জোরকদমেই। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলা পরিবেশ আন্দোলনগুলি কাছাকাছি আসছে ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার আন্দোলন এর। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ছাত্রছাত্রীরা অনেক বেশি সংখ্যায়, স্বতস্ফুর্ত ভাবে যোগ দিচ্ছে এই আন্দোলনে। প্রশ্ন করছে এই ব্যবস্থাকে।

চলমান আন্দোলন গুলির মধ্যে বিশেষত গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক আন্দোলনের বিভিন্ন অভিমুখ আমরা দেখতে পাই। এই আন্দোলনের মধ্যে থাকা একটা অংশ মনে করে চলছে যে রাষ্ট্রনেতাদের উপর চাপ দিলেই সমস্যার সমাধান তারা করে ফেলবেন। কিন্তু সমস্যা হল আইপিসিসি রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন এর জন্য দায়ী যেমন কর্পোরেট, তেমনই সাধারণ মানুষ। এখানে একটা কথা পরিষ্কার বুঝে নেওয়ার বোধহয় দরকার যে রাষ্ট্রপুঞ্জের রাষ্ট্ৰনেতারা বড় কর্পোরেটদের দায়ী করলেও তাদের গায়ে হাত দেওয়ার মতো সাহস বা ইচ্ছে কোনটাই তাদের নেই, কোনোকালেই ছিল না। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্থা আইপিসিসি পুঁজিবান্ধব রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থা। তারা সরাসরি পুঁজি ব্যবস্থার ঘাড়ে দোষ দেয় না। সমান ভাবে দায়ী করে মানবপ্রভাব, মানুষের ক্রিয়াকর্মকে। একরকম গুলিয়ে দেওয়া যাকে বলে। যাবতীয় সরকারি বেসরকারি প্রচার আপনার-আমার এবং আপনাদের-আমাদের ছেলেমেয়েদের এ বিষয়ে কি কর্তব্য তাও বলে দিচ্ছে। পরিবেশ নৈতিকতা শেখাচ্ছে। এই যেমন ধরুন বেশি করে গাছ লাগান, নতুন সিএফএল বাল্ব ব্যবহার করুন যাতে বিদ্যুৎ কম পোড়ে, কম ভোগ করুন, সপ্তাহে একদিন এক ঘন্টা কারেন্ট অফ রাখুন, কম গাড়ি চড়ুন, প্লাস্টিক কম ব্যবহার করুন ইত্যাদি ইত্যাদি প্রভৃতি। অর্থাৎ আমরা যারা যারা সাধারণ মানুষ আমাদের কৃতকর্মের জন্য নাকি ক্লাইমেট চেঞ্জ!

অথচ পেট্রোপণ্যের জন্যই তৈরি হয় প্লাস্টিক। প্লাস্টিক উৎপাদন বন্ধ করার ডাক কিন্তু দিচ্ছে না এই পরিবেশ নৈতিকতা শেখানো ‘মাষ্টারমশাই’রা। আপাতভাবে সাধারণ মানুষ, একটু আধটু পড়াশোনা করা লিবারাল জনতা এগুলোকেই পরিবেশ আন্দোলন, পরিবেশ বাঁচানো হিসেবে দেখে ‘আহ, কিছু তো একটা করলাম’ গোছের স্বস্তির ঢোক গিলছে। অথচ চাষজমি নষ্ট করে নতুন নতুন গাড়ি কারখানা হলে আমাদের আপত্তি নেই। ”কারখানা ওয়াহি বানায়েঙ্গে”র ন্যাকা কান্না কেঁদে চলেছেন তথাকথিত বাম দল। আর এখানেই এসে যায় পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারণাকে না বোঝার প্রশ্নটা। ”উন্নয়নের মডেল” হিসেবে নয়া উদারনীতি গত ৪-৫ দশক ধরে মানুষের সামনে যা যা হাজির করেছে তা তো প্রশ্নের মুখেই। এবং সেই মুনাফাকেন্দ্রীক উন্নয়ন আসলে প্রাণ-প্রকৃতির সাড়ে-সর্বনাশ করতে করতে গেছে এবং শেষ কয়েক বছরে তা ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে তা আজকের বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে।

পুঁজিবাদের গর্ভেই জীবাস্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে স্বর উঠেছে। গ্রীন পার্টি তৈরি হওয়া যার একটা বড়ো উদাহরণ। এই ধরনের গ্রীন ক্যাপিটালিস্টরা দাবী করছেন ফসিল ফুয়েল বন্ধ করে পুনঃনবীকরণ যোগ্য শক্তির বাজার তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ সৌর বিদ্যুৎ। অনেকে এই বক্তব্যে সমর্থন করে বিকল্প শক্তির বাজার তৈরিতে নেমেও পড়েছেন। কিন্তু সমস্যাটা আরও গভীরে। প্রশ্নটা কি আদৌ সোলার শক্তি বনাম ফসিল ফুয়েল? না শক্তির চাহিদার? আদৌ কি এত শক্তি উৎপাদনের প্রয়োজন আছে? আজ্ঞে আছে। যদি পুঁজিবাদ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চায়, যদি নেটফ্লিক্স, হটস্টার, গুগুল মিট ব্যবসা আরও চালাতে হয়, লাগাতার মুনাফার গ্রাফটা উর্ধ্বগামী রাখতে হয় তাহলে আরও আরও শক্তির প্রয়োজন, তা সেটা ফসিল ফুয়েল থেকেই আসুক বা সৌরশক্তি থেকে, পুঁজিবাদের কিছু আসে যায় না। বরং সে দুটোরই বাজার তৈরিতে মননিবেশ করেছে। বিরুদ্ধ স্বরকে আবছা একটা ‘বিকল্প’ দিয়ে সে নতুন বাজার তৈরি করতে নেমে পড়েছে। আর সেখান থেকে লাভবান হচ্ছে গ্রীন ক্যাপিটালিস্টরা।

কি হবে ‘উন্নয়ন’? কী তার ‘বিকল্প’, সবটাই নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রণ করে আসছে পুঁজি। ফলে গোড়ায় গন্ডগোলকে আড়াল করার ফন্দীফিকির এর প্রভাব একেবারেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না চলমান আন্দোলনগুলোও। আবার বেশকিছু ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবস্থা বদলের দাবীও শোনা যাচ্ছে জোরালো ভাবে। তাদের প্রবেশ বিন্দুগুলিও বেশ অন্যরকম। বিভিন্নতায় ভরপুর। ফলে সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুৎ জগাখিচুরি মার্কা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে আজকের পরিবেশ আন্দোলন, জলবায়ু সমস্যাগুলো।

COP26 থেকে কোন সমাধান বেরোবে কিংবা রাষ্ট্রনেতারা জলবায়ু সমস্যার সমাধান করবেন পুঁজিবাদীদের কাঠগড়ায় তুলে এ আশা করাই সময়ের অপচয়। ঠিক এই কারণেই কিয়োটো, কোপেনহাগেন, পারি, বা জলবায়ু-পরিবর্তনের সমাধানের জন্য সব আর্ন্তজাতিক উদ্যোগ শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। পুঁজিব্যবস্থার নিজের নিয়মেই যেহেতু তাকে বাড়তেই হবে, তবে এই তথাকথিত উন্নয়ন বা শিল্পসভ্যতার বর্তমান চেহারার বদল ঘটানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, ঠিক যেমন সম্ভব নয় কয়লা বা খনিজ তেল পোড়ানো বন্ধ করা বা কম করা। অথচ কয়লা বা তেল জাতীয় জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কম না-করলে, কার্বন গ্যাস ছাড়াও কম করা যায় না। ঠিক যে যে কর্পোরেশানগুলো সবচাইতে বেশি দূষণ ঘটায়, যারা জলবায়ু-পরিবর্তনের জন্য সবচাইতে বেশি দায়ী, তারাই এই বাজার থেকে সবচাইতে বেশি মুনাফা তোলে। ট্র‍্যাজেডী কারে কয়!

এতদিন অবধি ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ -এর দাবিতে গত তিন দশক ধরে পৃথিবীতে অসংখ্য প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। যার বেশির ভাগটাই বাৎসরিক কোনো সামিট এবং শীর্ষ বৈঠককে কেন্দ্র করে। চলমান আন্দোলনে আছেন বেশকিছু নামজাদা এন.জি.রা-ও। তাদেরও আবার বিভিন্ন দাবী। আর বাকিটা হয়েছে একেবারেই জীবন-জীবিকার সাথে জুড়ে থাকা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এই বিভিন্নধর্মী প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে জলবায়ু-রাজনীতির কি অন্য কোন চেহারা তৈরি হয়ে উঠছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক জলবায়ু-রাজনীতির চাইতে অন্যরকম? সেই ১৯৯২-এর রিও বৈঠক থেকে শুরু করে ২০১৫-র পারি বৈঠক পর্যন্ত জলবায়ু-রাজনীতি বলতে যা চলেছে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই মুনাফাকেন্দ্রীক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে আপাতভাবে মলম লাগাবার কাজ।

বর্তমান আন্দোলনগুলো থেকে কেউ কেউ দাবি করছেন, কার্বন গ্যাস বেশি ছাড়ে এমন সব কাজের ওপর প্রচুর ট্যাক্স চাপালেই সমস্যার সমাধান হবে। আবার কেউ বলছেন, যে যে দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের অন্যান্য দেশ টাকা দিক প্রযুক্তির উন্নতির জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হল এই সবরকম দাবীই এই ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখার কথাই বলছে। এই ব্যবস্থার মধ্যেই সমাধান খুঁজতে চাইছে। পরিবেশের সাথে, প্রকৃতির সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এর দর্শন এর উল্টোদিকে থাকা এই নয়াউদারবাদী দর্শন অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে আছে সমাজের কোণে কোণে। ফলে লড়াইটা শুধুমাত্র একটা COP-26 এ রাষ্ট্রনেতাদের কতটা চাপ দিতে পারছি কিংবা জীবাস্ম জ্বালানির পরিবর্তে আরেক ধরনের শক্তির বাজারকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি কিনা কিংবা কম বিদ্যুৎ  ব্যবহার করছি কি না তা শুধু নয়;  লড়াইটা এসবের থেকে অনেকটা, অনেকটা উঁচু স্তরের। আর রাস্তার লড়াই, দৈনন্দিন লড়াইয়ের পাশাপাশি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দার্শনিক লড়াইটাও আজ সময়ের দাবী। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমাজের মধ্যে চর্চার পরিসরকে উন্মুক্ত করা, প্রান্তিক উপকূল এলাকার মানুষের প্রত্যেক বছর ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ হয়ে ভিটে মাটি থেকে উজাড় হয়ে যাওয়া, নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, সস্তার শ্রমিকে পরিণত হওয়া এসব কিছুর গভীর বাস্তব অনুসন্ধান, সেই সমস্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার লড়াইয়ের সাথে নিজেদের যুক্ত করা পরিবেশ আন্দোলনের এন্ট্রি পয়েন্ট থেকেও হতে লাগবে। পুঁজিবাদ যেখানে চলমান বিশ্বব্যাপী আন্দোলন কে নিজের লজিকে ব্যবহার করে সেখান থেকেও মুনাফা তৈরির রাস্তা খুঁজছে, আমরা কি সরে আসব সেখান থেকে? একেবারেই না। বরং সেই আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের কথাগুলো কীভাবে জোরেসোরে সমাজের বুকে হাজির করতে পারি সেটাও আমাদের কাছে আজ “অ্যাসিড টেস্ট”। সময় বেশি নেই, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। গ্রেটাদের আন্দোলনের মধ্যে একাধিক ভাবনা, মত-পথের সংশ্লেষ যেমন ঘটছে, সেই আন্দোলনে থেকেই আমাদের মুনাফাকেন্দ্রিক, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিরোধী নয়া উদারবাদী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার ডাক জোরেসোরে রাখতে হবে। রাখতেই হবে। এবারের ক্লাইমেট স্ট্রাইক এর মূল স্লোগানঃ #UprootTheSystem. যা আসলে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসার চেষ্টা করছি, তার জন্য বিভিন্ন স্তরে লড়াই সংগ্রাম করছি। আর সেই স্লোগানকে আমরা পরিবেশ-প্রকৃতি তথা জীবজগত কে বাঁচাতে, পুঁজির ‘উন্নয়ন’ এর মডেলকে ছুঁড়ে ফেলে এক পরিবেশবান্ধব, স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এর দর্শন সম্বলিত এক নয়া ব্যবস্থা গড়ার কাজে ব্যবহার করব না? ক্লাইমেট জাস্টিস কি সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক জাস্টিস ছাড়া সম্ভব?

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের প্রাক্কালে কিছু জরুরী কথা

Leave A Comment