রাজনীতি বিষয়ক কিছু কথা, যা সবাই জানে

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত রাজনীতি

Last Updated on 7 months by admin

পার্থপ্রতিম মৈত্র

 

 

ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে – নির্বাচন কমিশন ভোট ঘোষণা করার সাথে সাথে। যেসব দল ভোটে দাঁড়াচ্ছেন তাদের কথা বিভিন্ন সভায় ও সংবাদমাধ্যমে  শোনা যাচ্ছে ও যাবে। কিন্তু এর বাইরে রয়েছে নাগরিক সমাজ – তাঁদেরও আছে নানা রঙের, নানা পক্ষের ও বিপক্ষের মতামত বিশ্লেষণ।  সেসব মতামত, বিশ্লেষণগুলির সাথে এদেশ আমার’-এর বক্তব্য সব সময় মিলে যায় তা নয়। তবুও আমরা এই সব মতামত ও বিশ্লেষণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা দরকার বলে আমরা মনে করি। আজকের মতামত ও বিশ্লেষণে পার্থপ্রতিম মৈত্র।

 

 বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলার মানে এই নয় যে বিজেপি ছাড়া বাকী রাজনৈতিক দলগুলি ধোয়া তুলসীপাতা, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, এবং গণদরদী। বিজেপির জন্মের আগে কংগ্রেস এই সাম্প্রদায়িকতা এবং দুর্নীতি উভয় দায়িত্ব পালন করতো। এখন এনডিএ এবং প্রতিটি আঞ্চলিক দল এবং জোট, সর্বভারতীয় এবং স্থানীয় স্তরে এই দায়িত্ব পালন করে। যেহেতু সংসদীয় রাজনীতি সবচাইতে কম বিনিয়োগে সবচাইতে বেশী মুনাফার ব্যবসাক্ষেত্র, অতএব দীর্ঘসময় ধরে নিকৃষ্টতম মানুষগুলিই এ ব্যবসার ক্ষেত্রটির ইজারাদখল নিয়ে রেখেছে। ভোটার হচ্ছে এই ব্যবসার পুঁজি। যে যত ভোটার পটাতে পারে, তার ব্যবসার রমরমা ততো বেশী। প্রতিটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠির একটি ইউনিক সেলিং পয়েন্ট থাকে। যেমন মৌলবাদী হিন্দুত্ব (বিজেপি), যেমন ইসলামী মৌলবাদ (আইএস এফ), যেমন সাম্যবাদ (সিপিএম), সমাজতন্ত্র (কংগ্রেস), আর যাদের আলাদা ইউএসপি নেই তাদের টার্গেট বিরোধী দলের ছিদ্রান্বেষণ (তৃণমূল কং)। নাগরিক বা ভোটারদের অধিকাংশ প্রকৃতিগতভাবে নির্বোধ, জড়, অজ্ঞ, অলস ও বশ্য হলেও, চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য বিচারে স্বার্থান্ধ, দুর্নীতিপ্রবণ, এবং সুবিধাবাদী শ্রেণীভুক্ত। মানুষ বেসিকালি অসৎ বলেই তারা কখনই সৎ প্রতিনিধি খুঁজে সময়ের অপব্যবহার করে না। সততা একটি গুণ যা অর্জন করতে হয়। ভোটার তার প্রতিপক্ষ খুঁজে বেড়ায়, আর রাজনৈতিক দলগুলি সেই প্রতিপক্ষের যোগান দেয়। কখনও দুটি ভাষা (যেমন অসমীয়া-বাংলা অথবা মাতৃভাষা-সরকারী ভাষা), কখনও দুটি ধর্ম (যেমন হিন্দু এবং মুসলমান),  কখনও দুটি অর্থনৈতিক অবস্থান (বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত), কখনও আভ্যন্তরীণ সমস্যা (যেমন নাগরিক ও অভিবাসী), কখনও তা ঐতিহাসিক (দেশভাগ বা রাজ্যভাগ), কখনও তা আন্তর্জাতিক (পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ), কখনও তা ব্যবসায়িক (জয় শাহ  বা বদরুদ্দীন আজমল), আর সর্বোপরি রয়েছে বিপুল দুর্নীতি আর চূড়ান্ত ব্যর্থতা। তবু ভোটার যার বেশী, ক্ষমতার সোপানে তার স্থান ততো উঁচুতে।

 

আমার আশৈশব রাজনৈতিক  অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, কোনও দল বা সঙ্ঘ বা গণ বিষয়কক্ষেত্র গণিতের সঙ্গে সম্পর্কিত, রসায়নের সঙ্গে নয়। অর্থাৎ বহু মানুষ যে দলে যুক্ত হন, তাঁরা সেই দলের আদর্শ অনুসারে নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তিত করেন না, বা করতে পারেন না। দলপতির অধীনে থাকে দলীয় কর্মী অনেক মানুষের প্রাণ। সেই মানুষগুলি কিন্তু তাদের স্বকীয় সত্তা বিসর্জন দিয়ে, দলের আদর্শে, ছাঁচে নিজেদের মোল্ড করে, একটিমাত্র সামগ্রিক সত্তা হয়ে ওঠার জন্য আসে না। অর্থাৎ দল হচ্ছে বহু মানুষের সামেশন, বহুচরিত্রের যোগফল, মিশ্রণ (কখনই দ্রবণ নয়)। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় একটি মার্ক্সবাদী দলের সরকারকে এ রাজ্যের মানুষ বিপুল সমর্থন জানালো প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে। দলটিকে দেখে প্রত্যয় হতো এই রাজ্য, এই মানুষগুলো সাম্যবাদী বামপন্থী এবং অসাম্প্রদায়িক। তারা রাতারাতি ভোল পাল্টে দক্ষিণপন্থী মমতা অনুসারী হয়ে যেতে, বা সাম্প্রতিক সময়ে ঘোর সাম্প্রদায়িক বিজেপির দিকে ঢলে পড়তে এতটুকু সময় নিচ্ছে না। আমার বিশ্বাস, ব্যক্তি বারবার দল বা সমর্থন  পরিবর্তন করলেও তাদের নিজের সত্তা, চরিত্র, পরিবর্তিত হয় না। নেতা মন্ত্রীরা অবশ্য সবসময়ই অন্যদের থেকে আলাদা। যদিও দল টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বারবার বলা হয় যে দলে সবাই সমান, দেশে সবাই সমান, গণতন্ত্রে সবাই সমান। তথাপি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের স্বকীয় সত্তাগুলোকে এক জায়গায়, এক আদর্শে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। যেহেতু তারা মিশ্রণ, দ্রবণ নয়, ফলে সঙ্ঘবদ্ধ রাখতে তাদের প্রয়োজন পড়ে, ভিতরের বা বাইরের কোনও নিয়ন্ত্রণশক্তির। এইভাবেই দলে হায়ারার্কি গড়ে ওঠে।

 

গণতন্ত্র কখনোই তার নাগরিকদের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে না রাখা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিককে ধরে নেওয়া হয় যেনিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তারা অপরাধ করবেই এবং তাদের সেই অপরাধ প্রতিহত করার জন্য রাষ্ট্র এবংসব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। দলের চোখে প্রতিটি সদস্য এবং রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি নাগরিক হলো পোটেনশিয়াল অপরাধী। গণতন্ত্রে সহযোগিতার চেয়েও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বেশী বিস্তৃত। এবং প্রতিযোগিতা বলেই পারস্পরিক সংঘর্ষের বাতাবরণে নাগরিক ব্যক্তি মানুষেরা ভালনারেবল থাকে। আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। ফলে এখানে একটি পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক থাকে দলের সঙ্গে কর্মী-সমর্থকদের, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের। আমার দুর্বলতাকে দল সুরক্ষা দেবে এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে,প্রাপ্যের চাইতেও বেশী সুযোগ সুবিধার যোগান দেবে। প্রতিদানে দলীয় কর্মীরা নেতাদের প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হতে সহায়তা করবে।।অতএব যত বেশি সংখ্যক সমর্থক এবং কর্মীরা অশিক্ষিত থাকে, অচেতন থাকে, তত নেতৃত্বের সুবিধে। দলকে একটি অখন্ড আদর্শে বিশ্বাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সুবিধে।

যখনই এই নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যায়, তখনই দল ভাঙ্গতে শুরু করে। তখনই দলের মধ্যে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিগত স্বার্থ, ব্যক্তিগত অন্বেষণ, আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষে সবসময়ই কিছু মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য দলের অন্যদের ব্যবহার করে। সেইজন্যই দল গঠিত হয়, সোসাইটি গঠিত হয়। একক মানুষ মানে, দুর্বল মানুষ। তারা যৌথ হয়, যাতে যৌথতা তার দুর্বলতাগুলোকে ঢেকে দেয়। সেই জন্যই দল কখনো ব্যক্তির উর্ধে উঠতে পারেনা। যখন নতুন করে শিবির বিন্যাস ঘটতে থাকে, তখন রাজনীতির প্রাঙ্গনে, বিচারব্যবস্থার অঙ্গনে, সীমান্ত বা  আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, মিডিয়ায়, আমলাতন্ত্রেঅনর্গল মিথ্যা বলে যেতে হয়। যুক্তি সাজানোর প্রয়োজনে যুক্তি সাজাতে হয়। দল এবং ব্যক্তির সম্পর্কের নতুন বিন্যাস ঘটতে থাকে।

 

রাজনৈতিক গণতন্ত্র নেতৃত্ব কে এতই ক্ষমতাবান করে তোলে যে, সমর্থকদের প্রতিনিধিত্বের শর্তগুলি পূরণ না করে দলবদল করলেও তাদের কোনো উত্তর-দায়িত্ব থাকে না। একবার নির্বাচিত করে দিলে এই নেতারা সমর্থকদের হাতের নাগালের বাইরে। অর্থাৎ আমি একজন নির্বাচক হিসেবে যদি অসাম্প্রদায়িকতা কে অতিআবশ্যক প্যারামিটার হিসেবে চিহ্নিত করি,এবং নির্বাচিত করার পর সেই প্রতিনিধিযদি একটি সাম্প্রদায়িক দলে যোগদান করে, তাহলেও নির্বাচক হিসেবে আমার কিছু করার থাকে না। আসন্ন নির্বাচনে যদি টিএমসি বা বিজেপি জিতে যায়, তবে অন্যান্য দলের নির্বাচিতেরা যে লাইন দিয়ে দলবদল করবেন না, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। অর্থাৎ টিএমসি জেতার পর যদি বিভিন্ন দল থেকে লাইন দিয়ে সবাই টিএমসিতে ঢুকে পড়ে বা এই নির্বাচনের আগে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা অনুমান করে যারা ইঁদুরের মত ডুবন্ত জাহাজ ছেড়ে পালাচ্ছে, প্রতিপক্ষ শিবিরে গিয়েও তারা কিন্তু সমান ক্ষমতাই উপভোগ করবেন। আসলে দলের সমর্থকদের মতোই দলের নেতৃত্বেরও কোন চরিত্র বৈশিষ্ট্য থাকেনা। আসলে এটি গণতন্ত্রের নিজস্ব সংকট এবং এই সংকটের ফলে প্রতিটি দলের ভেতরের সাধারণ সমর্থক, দলীয় কর্মী এবং দলপতি বা নেতা আসলে গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে ভেঙ্গে দিচ্ছে। ফলে কোন একদিন কোন এক শুভ/অশুভ মুহূর্তে যদি দেখা যায় মানুষ গণতন্ত্রে, নির্বাচনে এবং সংবিধানে আস্থা হারিয়ে ফেলছে, তাহলে তাদেরকে দোষ দেওয়া যাবে না।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on রাজনীতি বিষয়ক কিছু কথা, যা সবাই জানে

Leave A Comment