হুমকিকে পরোয়া থোড়াই : স্বচ্ছতা ও সুবিচারের দাবিতে আর.জি.কর মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা লড়ছে

আজকের খবর গণ-আন্দোলন বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 1 week by admin

 

‌‌‌‌হুমকিকে পরোয়া থোড়াই :

স্বচ্ছতা ও সুবিচারের দাবিতে আর.জি.কর মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা লড়ছে

অনিন্দ্যসুন্দর মন্ডল (হাউজ স্টাফ, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল)

 

“ভুলের মুখে মারছি চড় / আমরা সবাই আর জি কর।”

আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রছাত্রীদের অনশন অতিক্রম করে গেছে ২৫০ ঘন্টারও বেশি। কর্তৃপক্ষ গুচ্ছ হুমকি, বাড়ি বাড়ি পুলিশ পাঠানো,এমনকি বাড়িতে পুলিশ পোস্টিং বসিয়ে দেওয়া, শাসকদলের স্থানীয় গুন্ডা দ্বারা মারধর ব্যাতীত কিছুই দেয়নি। একটু একটু করে সময় যায় আর একটু একটু ভেঙে যায় ছাত্রছাত্রীদের আশা-ভরসা – অথোরিটির প্রতি, অভিভাবকসম প্রিন্সিপালের প্রতি, সর্বোপরি এই ঘৃণ্য ক্ষমতার রাজনীতির উপর দাঁড়িয়ে থাকা সমগ্র ব্যবস্থাটির প্রতি। আর, তখনই আকাশ থেকে বজ্রের মতো নেমে আসে ‘আঠেরো’র প্রত্যাঘাত।

২০১৭ সাল থেকে নানান কারণ দেখিয়ে কলেজে কলেজে তুলে দেওয়া হলো ভোটের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ইউনিয়ন গঠন করে কলেজ পরিচালনার ব্যবস্থা। বদলে আনা হলে স্টুডেন্ট কাউন্সিল ব্যবস্থা। ইলেকশনের বদলে এলো সিলেকশন। লক্ষ্য ছিল কলেজের সবকিছু অথরিটির মাধ্যমে কন্ট্রোল করা, এইভাবে ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগটুকু কেড়ে নেওয়া হলো, শেষ করে দিতে চাওয়া হলো বিরুদ্ধতার শেষ স্বরটিকেও। নিজেদের মধ্যে মোটামোটি একটা বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাউন্সিল তৈরী হতে লাগল। আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও তাই চলছিল। কিন্তু এতে তো গণতন্ত্রের ক্ষেত্রটিকে পুরোপুরি শেষ করা গেল না। তাই এবার কাউন্সিল তৈরীতেও নির্লজ্জ একনায়কতন্ত্র আর তৈলমর্দন তত্ত্বের প্রয়োগ করা হলো। তিনজন শাসক দল ঘনিষ্ঠ ও শাসকদলের উপরের দিকের নেতানেত্রীদের পদলেহনে ওস্তাদ তিন ছাত্রের কাউন্সিলের ওপর সমস্ত ক্ষমতা সঁপে দেওয়া হল। আর তারা তা হাতে পেয়ে অপব্যবহার করার আগে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেনি। এতদিন কাউন্সিল তৈরীতে হোস্টালাইট, ডেস্কলার এবং হোস্টেলাইট দের মধ্যে – আবার বিভিন্ন হোস্টেলের নিরিখে পূর্বনির্ধারিত অনুপাত অনুসারে ছাত্রছাত্রী নিয়ে কাউন্সিল তৈরী হতো। কিন্তু সেসবকে এবার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বৈরাচারী কায়দায় তৈরী হলো কাউন্সিল। আর তা থেকেই শুরু হয় সমস্যা, যে সমস্যার বীজ আসলেই স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্তের মধ্যেই নিহিত ছিল। আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রছাত্রীরা স্বাভাবিক ভাবে এই একনায়কতন্ত্র, অথোরিটির এই স্বৈরাচারিতা মেনে নিলেন না। তারা প্রতিবাদ জানালেন। দাবি করলেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাউন্সিল গঠন করা হোক। সাথে হোস্টেল কাউন্সিলিং ও হাউজস্টাফশিপ কাউন্সিলিং এর অস্বচ্ছতাও দূর করা হোক।

বারবার আবেদন,অথোরিটির সাথে মিটিং কথাবার্তা চলার পর তাদের স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে শাসক দলের নেতানেত্রীরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন! সরাসরি তারা নিজেদের একনায়কতন্ত্রী হিসাবে স্বীকার করে নেন স্টুডেন্টদের সামনে!

‘শেষ বজ্রপাত? নামিল আঘাত।’

এমন অভিভাবকসম প্রিন্সিপাল ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে যে ব্যবহার উপহার দেন তাকে ব্যাখা করতে গেলে বাংলা অভিধানে নতুন শব্দ সংযোজনের প্রয়োজন হবে নিশ্চিত। পূর্বেও বিভিন্ন কলেজে অসংখ্য আন্দোলন হলেও প্রিন্সিপালের এমন দূর্ব্যবহার ইতিহাসে সত্যিই বিরল। তার উপর চলল স্থানীয় গুন্ডাদের দিয়ে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া।

উপায়ান্তর না দেখে গত ৩ রা অক্টোবর ছাত্রছাত্রীরা অনির্দিষ্টকালীন অনশনের সিদ্ধান্ত নেন। ৩০ জন অনশন শুরু করেন। পরে বেশ কিছুজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভরতি হলে নতুন কিছুজন আবার অনশনে অংশগ্রহণ করেন।প্রিন্সিপাল যে অভব্য আচরণ করে গেছেন গত এক মাস ধরে, তাতে তাদের অন্য দাবি গুলি ছাপিয়ে প্রথম দাবি হিসেবে উঠে এসেছে প্রিন্সিপালের পদত্যাগের দাবি।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন ডাক্তারি সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস্‌ আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একাধিক প্রগতিশীল গণসংগঠনের পাশাপাশা, বিভিন্ন ছাত্রছাত্রী সংগঠন এবং গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষজনও তাদের দু’হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছে। সমর্থন জানিয়েছে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও হাউজ-স্টাফরা। গত ৯ই অক্টোবর (শনিবার) থেকে RG KAR এর ইন্টার্নরা কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেয় অথোরিটির উদাসীনতায় বিরক্ত হয়ে। (যদিও তাঁরা জরুরী বিভাগে রোগী দেখা বন্ধ করেন নি)। গত বুধবার (১৩ ই অক্টোবর) কলেজ প্রাঙ্গনের মধ্যে একটি মিছিল করে ছাত্রছাত্রীরা। গতকাল (১৪ ই অক্টোবর) একটি মানব শৃঙ্খল তৈরী করে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা – কলেজের এমার্জেন্সি গেট থেকে বেলগাছিয়া মেট্রো পর্যন্ত। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ডাক্তারি সংগঠন ও ছাত্রছাত্রী সংগঠনের সদস্যরাও। এই কর্মসূচী চলার সময় তৃণমূলের স্থানীয় গুন্ডারা ছাত্রছাত্রীদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনলে একজন ইন্টার্ন ডাক্তার সহ তিনজন ছাত্র আহত হয়।

আর ভবিষ্যতে এরকম অনেক আঘাত যে শাসকদলের থেকে আসতে চলেছে,জানে তারা। কিন্তু মাঠ ছেড়ে না পালিয়ে তারা প্রস্তুত হচ্ছে একটা দুর্দান্ত লড়াই দেওয়ার জন্য। পুজোর সময়  আলোর শহরে এককোণে অন্ধকারে পড়ে ছিল এরা, না খেয়ে। তাও লড়াই ছাড়েনি। আর এই মানসিকতাই জানান দেয় যে আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রছাত্রীরাও এর শেষ দেখে ছাড়তে চায়।

কলেজে কলেজে ইউনিয়ন তুলে দিয়ে যেভাবে অগণতান্ত্রিক কাউন্সিল চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা,তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এই আন্দোলন সেই প্রতিবাদের আগুনে কতটা ঘৃতাহুতি করে, সেটার দিকেই নজর থাকবে সকল গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের। শত হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও এই লড়াইয়ে আর.জি.করের ছাত্রছাত্রীরা জিতবে এ আশা আমাদের আছে।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on হুমকিকে পরোয়া থোড়াই : স্বচ্ছতা ও সুবিচারের দাবিতে আর.জি.কর মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা লড়ছে

Leave A Comment