ফ্যাসিষ্ট শক্তি ভোটে হারলেও জনবিচ্ছিন্ন হয় নি – সমাজ থেকে এদের জনবিচ্ছিন্ন করতেই হবে

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত রাজনীতি রাজ্য

Last Updated on 4 months by admin

ফ্যাসিষ্ট শক্তি ভোটে হারলেও জনবিচ্ছিন্ন হয় নি –  সমাজ থেকে এদের জনবিচ্ছিন্ন করতেই হবে  

অজয় বক্সী

 

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল পুনরায়  ক্ষমতায় ফিরে এলো। ফ্যাসিষ্ট শক্তির পরাজয় নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে খুশির খবর। সিপিএম -কংগ্রেস এর দিশাহীনতা বেশিরভাগ মানুষকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। এবারে নির্বাচনে মানুষ তার ভোটকে আগের তুলনায় অনেকটাই রাজনৈতিক লড়াই হিসাবেই নিয়েছিল। তাই টি এম সি, বি জে পি ছাড়া অন্যন্য দলগুলি দাঁত ফোটাতে পারে নি (আই এস এফ ১ টি বাদে)। আসন সংখ্যা টি এম সি – বি জে পি – এর মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলি ছাড়াও প্রগতিশীল নাগরিক, ছাত্রছাত্রীদের একাংশের সক্রিয়তা এতে অনুঘটকের কাজ করেছে।

এই প্রেক্ষিতে একটা কথা চলেই আসে, তা হল কি এমন ঘটনা ঘটলো যাতে গত বিধান সভা (২০১৬)-র ৩ থেকে ৭৩ টি আসনে জয় লাভ করলো আর এস এস-এর রাজনৈতিক মুখ বিজেপি-র মতো একটি ফ্যাসিষ্ট দল! যেখানে পশ্চিমবঙ্গে সেই অর্থে মানুষের রুটিরুজির প্রশ্নে এরা  কোন ভূমিকাই নেয় নি। কেবল ফাঁকা বুলি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছাড়া কিছুই করে নি।

এর পিছনে কারণ খুঁজতে গেলে অনেক ঘটনা সামনে চলে আসে। ২০১৬ তে বিপুল ভোটে জিতলেও তৃণমূল দলটির  দুর্নীতি,  স্বজনপোষণ,  অগণতান্ত্রিকতা  শ্রমজীবী  মানুষের থেকে এদের ক্রমশ দূরত্ব তৈরি করেছে। পঞ্চায়েত ভোটে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারেনি, ১০০ দিনের কাজে প্রকৃত যাদের চাহিদা তারা বঞ্চিত হয়েছে। আমফানের টাকা নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। মানুষ ক্রমশ বিক্ষুব্ধ হয়েছে। আর যে পরিমাণ বিক্ষুব্ধ হয়েছে সেই পরিমানে তারা ফ্যাসিষ্ট বিজেপি কে অবলম্বন করেছে,  কেননা কংগ্রেস -সিপিএম বা লড়াকু বামপন্থীরা তাদের কাছে বিকল্প হতে পারেনি। ১৬-তে ক্ষমতায় আসার পর  মমতা ব্যানার্জী শ্রমিকদের আইনি অধিকার বা রুটিরুজি রক্ষা করতে কোনো ভূমিকা নেননি। বন্ধ  কারখানা খোলে নি। নতূন কর্মসংস্থান হয় নি। সিপিএম এর নেতারা কারখানায় কারখানায় যে ভাবে মালিকের দালালি করে বেড়াতো, টিএমসি নেতারা তার থেকে কোন অংশে কম যায় নি। শ্রমজীবীদের একাংশ তাদের উপার্জনের ব্যাপারে অসহায় হয়ে বাধ্য হয়ে বিজেপির দিকে হেলে পড়ে। শ্রমজীবীরা বিজেপির ফ্যাসিষ্ট চরিত্র বিচার না করেই  তৃণমূলের আক্রমণ থেকে বাঁচার লক্ষ্যে  বিজেপিকে অবলম্বন করে।

বর্ধমানের আউসগ্রাম অঞ্চলে ১০০ দিনের কাজের ব্যাপারে লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায় নিজের শ্রমের টাকা একটা অংশ কাটমানি হিসাবে স্থানীয় নেতাদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এ ঘটনা রাজ্যের প্রায় সর্বত্র কমবেশি একই। বস্তুত ভোটের বহু মাস আগেই বোঝা যাচ্ছিল ১০০ দিনের কাজকে নিয়ে তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের যে চরম দুর্নীতি তার থেকে বাঁচতে গ্রামের বহু মানুষ বিকল্প শক্তির খোঁজে আছে, আর সেই সুযোগটা যে বিজেপি কাজে লাগিয়েছে তা একটু নজর করলেই বোঝা যাচ্ছিল।

সংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবন বামফ্রন্ট আমলের মতোই এই আমলেও আরো কোণঠাসা হয়েছে। ক্যালকাটা টেলিফোনস-এ ঠিকা শ্রমিকদের  রাতাতাতি কাজ থেকে বসিয়ে দেবার পরিকল্পনা করে ম্যানেজমেন্ট।  নতূন কালা সেই SLA  চুক্তিতে বাম-ডান সব ইউনিয়নের নেতারা সই করে আসে।  ঠিকা শ্রমিকরা নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে কাউকে সামনে না পেয়ে নিজস্ব ইউনিয়ন গড়ে তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক-বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে সেখানে নেতৃত্বের উপর একাধিকবার হামলা চালানো হয় তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে। শ্রমিকরা দীর্ঘ কয়েকমাস বেতন না পেলেও এই সব  নেতাদের কোন হেলদোল নেই। শুধুই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বার বার। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে আদালতে যান এবং আদালত বেতন দেওয়ার রায় দেয়। সংগঠিত ক্ষেত্রে সি পি এম এর ইউনিয়ন গুলি যেভাবে শ্রমিকদের সাথে দ্বিচারিতা করে গেছে, তৃণমূলের নেতৃত্বও আজ শ্রমিকদের সাথে সেই  দ্বিচারিতা সমান তালে করে যাচ্ছে। ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন নীতিতে তারা যে যে পরিমাণ সায় দিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকদের অধিকার সেই সেই পরিমাণে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই বিএসএনএল সহ সংগঠিত শিল্পের এই সমস্ত শ্রমিকরা তাদের নিজেদের প্রতিদিনকার  জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য ক্রমশ মনের দিক দিয়ে বিজেপি এর দিকে এগিয়ে গেছে। তারা রাজনীতির গভীরে গিয়ে দেখতে পারছে না। কংগ্রেস, এন ডি এ, বাম সমর্থিত কংগ্রেস, বিজেপি এই সমস্ত শ্রমিকবিরোধী নীতি গুলি নিয়ে চলেছে। আর আজকে আসলে বিজেপি-ই এই সব শ্রমিক-বিরোধী নীতির মূল পান্ডা।

যেসব কারখানায়  ইউনিয়ন ছাড়াই শ্রমিকদের কন্ট্রোল করা যায় সেখানে ইউনিয়ন না করেই তৃণমূল কংগ্রেস  ম্যানেজমেন্ট-এর পক্ষে কাজ করে। আর যে সব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সংগঠিত  হবার চাহিদা থাকে অথবা ইউনিয়ন এর মাধ্যমে গেলে ম্যানেজমেন্ট-এর  কাছে গুরুত্ব পাওয়া যাবে, সেসব ক্ষেত্রে এরা ট্রেড ইউনিয়ন করে বা করতে সচেষ্ট হয়। তবে শ্রমিকদের স্বাধীন উদ্যোগে এরা কখনই সায় দেয় না বরং বিরোধীতা করে। ধর্মঘট তো কখনই নয়! পার্টির নেতৃত্বের নির্দেশের ওপরই এরা ইউনিয়নকে পুরোপুরি  নির্ভরশীল করে রাখে। এই সবের মধ্যে দিয়ে আঞ্চলিক তৃণমূল নেতারা একদিকে শ্রমিকদের ধরে রাখে আর পাশাপাশি মালিকদের সাথে রফাও  করতে পারে। এছাড়া পার্টির মিটিং-মিছিলে জমায়েতের ব্যাপারেও ইউনিয়ন গুলিকে কাজে লাগানো হয়।

গত ১০ বছরে বামফ্রন্ট ক্ষমতায়  ক্ষমতায় না থাকায় সিটুর কিছু পরিবর্তন নজরে এলেও তা  কৃত্রিম। আসল  চরিত্র কিছুই বদলায়নি। যেখানেই সুযোগ পেয়েছে  মালিকের সাথে বন্ধুত্ব করে এগোতে চেয়েছে। শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন আন্দোলন খেলা চালিয়ে গেছে ।

বিশ্বায়ন-এর যুগে ব্যাপক কর্মসংকোচ আজ সারা পৃথিবী জুড়ে।  ভারত ও তার থাকে আলাদা নয়। কোটি কোটি বেকারের সামনে ন্যূনতম বেতনের কাজ পাওয়া দায়।  তাই প্রতিনিয়ত কাজ চলে যাবার ভয়। আন্দোলন করতে গেলে হয় রাজনৈতিক চাপ নয়ত মালিকের আক্রমণ এই নিয়ে শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হতে পারছে না। শ্রমিকদের ধর্মের বা জাতের ভিত্তিতেও নিজেদের মধ্যে বিভেদ করে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে বিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করতে পারে না। এর পরও যদি সংগঠিত আন্দোলন দীর্ঘ মেয়াদি  হয় তবে সেক্ষেত্রে পেট চালাবার রসদ এর প্রশ্নে শ্রমিকরা সমস্যায় পড়ে। এছাড়া মালিকদের দলগুলির নেতাদের দালালির ফলে  শ্রমিকদেরকে নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলেছে। সর্বোপরি পুঁজিপতি  শ্রেণির দর্শন শ্রমিকদের মগছে ঢুকে বসে আছে, তার থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র রাস্তা সামাজিক বড় আন্দোলন, যার  বড়ই অভাব আজকের সময়ে।

এ দেশে SEZ চালু করার পথ দেখিয়েছিল সিপিএম।  বাম আমলে চালু হওয়া ফলতা SEZ-এ  আজ অধিকাংশ কারখানা  বন্ধ।  বাম নেতারা যেভাবে মালিকদের দালালি করতে গিয়ে শ্রমিকদের ভয় দেখিয়ে দমন করে রাখতো, আজ টি এম সি নেতারা সেই ভূমিকা রাখছে। গোটা ফলতা SEZ-শিল্পাঞ্চল জুড়ে বিরোধী কোন কন্ঠস্বর বরদাস্ত করা হয়না। শ্রমিকদের কাজ, বেতন পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে মালিক বা নেতাদের ইচ্ছার ওপর। যদি শ্রমিকরা কখনো কখনো নিজেদের অর্থনৈতিক দাবীতে নিজস্ব উদ্যোগে আন্দোলন বা ইউনিয়ন করতে যায় তাহলে হয় দমন না হলে ছাঁটাই, এর মাঝে কিছু নেই।  এমতাবস্থায় এই সমস্ত শ্রমিকরা নিজেদের বাঁচার স্বার্থে (ভুল ভাবে হলেও) ভিতরে ভিতরে তৃণমূলের বিকল্প দল হিসাবে বিজেপিকে সামনে চাইছে। যার প্রতিফলন ভোটে দেখা গেছে। সারা ভারতব্যাপি শ্রমজীবীদের উপর বিভিন্ন প্রশ্নে বিজেপি তার ফ্যাসিষ্ট কায়দায় হামলা নামিয়ে আনছে। সেকথা বেশির ভাগ মানুষ বুঝেছে বলেই এবারে তারা বিজেপি-র বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও গ্রাম অথবা শহরে  শ্রমজীবীদের একাংশ তৃণমূল-এর দুর্নীতি,  সন্ত্রাস এর কবল থেকে বাঁচতে বিকল্প হিসাবে যদি বি জে পি এর হাত ধরে তাহলে তার দায় কার?

তাই রাজ্যে ফ্যাসিষ্ট শক্তির পরাজয়ে আজ আমরা যারা স্বস্তি অনুভব করছি তাদের দায়িত্ব  আরো অনেক বেড়ে গেল।  ফ্যাসিষ্ট শক্তিকে সমাজ থেকে একেবারে জনবিছিন্ন করতে হলে শ্রমজীবী ও গণতান্ত্রিক মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই ও জোট তৈরি করাই একমাত্র রাস্তা, অন্য কোন শক্তি দিয়ে একে প্রতিস্থাপিত করা যাবে না।

 

  • লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী
  • মতামত লেখকের নিজস্ব
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on ফ্যাসিষ্ট শক্তি ভোটে হারলেও জনবিচ্ছিন্ন হয় নি – সমাজ থেকে এদের জনবিচ্ছিন্ন করতেই হবে

Leave A Comment