পুরাতন বাম মৃত, দীর্ঘজীবী হোক নতুন বাম

আজকের খবর নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা

Last Updated on 4 months by admin

                                                          সুকান্ত মানিক

এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যেমন পুরাতন বামেদের অস্তাচলে পাঠিয়ে দিয়েছে, তেমনি নতুন বাম রাজনীতির উত্থানের পথ উজ্জ্বল করেছে। বস্তুত, বহুকাল ধরে পশ্চিমবঙ্গ নতুন বামপন্থার উদয়ের অপেক্ষায় ছিল। এক্ষনে সেই সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে বলেই মনে হয়। কেন, সেই প্রশ্ন নিয়েই এই আলোচনা।

প্রথমত, এই প্রথম পুরনো বামেরা, অর্থাৎ সংসদীয় রাজনীতির পঙ্কে নিমজ্জিত বামফ্রন্টের শরিকরা তাদের প্রধান পান্ডা সিপিআই(এম)-এর বদান্যতায় ‘আগে রাম পরে বাম’ ফর্মূলায় অংক কষতে গিয়ে একেবারে শূন্যে পৌঁছে গিয়েছে। যদিও এদের আদর্শগত দেউলে দশা বহু আগেই প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলে তারা এই প্রথম দেউলিয়া হল। এটা জরুরী ছিল, কেননা রাজ্য-রাজনীতিতে এরা যে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, তা ভোট-সর্বস্ব এই দলগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। পশ্চিমবঙ্গের বিচক্ষণ জনগণ এদের শিক্ষা দেওয়ার সেই পথই বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এরপর কি এনারা ঘুরে দাঁড়াবেন? সে গুড়ে বালি। কেননা জনগণের থেকে শিক্ষা নেওয়া এনাদের ধাতে নেই। জনগণ তো সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম থেকে কেবল ভুলই করে আসছে, তাদের থেকে আর শেখার কী আছে!!

দ্বিতীয় উল্লেখ করার মতো বিষয় হল, এই প্রথম নতুন বাম শক্তি বিজেপি নামক ফ্যাসিবাদী দানবটিকে পরাস্ত করার সংগ্রামে রাজ্য-রাজনীতিতে একটা জায়গা করে নিয়েছে, সংসদীয় রাজনীতিতে একটা পরিমাণে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। রাজ্যের সাধারণ মানুষের সামনে বিজেপি যখন এক ভয়ংকর রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে, যখন পুরনো বামপন্থীরা সেই বিপদের দিকে চোখ বুজে থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকেই কার্যত প্রধান শত্রু ধরে নিয়ে প্রচার চালিয়েছে, তখন এই নব্য বাম শক্তি, যার মধ্যে নতুনদের সাথে বহু পুরাতন বামপন্থীও আছেন, আছে অসংখ্য ছোট-বড় গোষ্ঠী, দল-যুক্ত ও দলহীন ব্যক্তি, তাদের ছোট ছোটশক্তিগুলোকে সমবেত করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে লড়াই-এর ময়দানে। বিজেপি এবং সংঘ পরিবারকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বাচনে বাংলার মাটিতে এই অশুভ শক্তির পরাজয় সুনিশ্চিত করতেসমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে।

এই প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে দুটো কাজ হয়েছে: এক, হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামের একটা আবহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনী ফলাফলকেও একটা পরিমাণে প্রভাবিত করেছে। দুই, বিভিন্ন ছোট ছোট বাম ও প্রগতিবাদীশক্তিগুলির মধ্যে একটা সাধারণ কর্মসূচি-ভিত্তিক ঐক্য তৈরি হয়েছে, যা সংহত ও বিস্তৃত হলে এই রাজ্যে এক তৃতীয় বিকল্পের উদয় হয়তো অকল্পনীয় হয়ে থাকবে না। বিষয়টি একটু বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

ঘটনা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনী ফলাফল তৃণমূল কংগ্রেস দলটিকে ক্ষমতায় বসালেও, বিজেপি বিরোধীতায় সেই দলের থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক ও মতদর্শগতভাবে ক্ষুরধার ছিল ছোট ছোট এই বাম গোষ্ঠীগুলোর প্রচার। সেই দিক থেকে দেখলে নির্বাচনের এই ফলাফল এই উদীয়মান বাম ও প্রগতিবাদী শক্তি সমূহের পক্ষে আদর্শগত জয়। কেননা তৃণমূল দল ভোটের নিরিখে জয়লাভ করলেও এই দল বিজেপির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আদর্শগত লড়াই চালায় নি, তাই তাদের আদর্শগত জয়ের প্রশ্নই ওঠেনা।

যদি বিচার করা হয়, এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কেন বিজেপির তুলনায় তৃণমূল দলকে বেশি পছন্দ করল, কেনই বা বাম-কংগ্রেস জোটকে একেবারে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দিল, তাহলে বলতেই হবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বার্তা হল, রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজ্যের সাধারণ মানুষ যতটা না তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তার থেকে অনেক বেশি দিয়েছেন বিজেপির বিপক্ষে। অর্থাৎ বিজেপিকে কোনো ভোট নয়, এই বার্তাকে মানুষ রূপান্তরিত করেছেন বিজেপিকে পরাস্ত করতে হবে এই ইতিবাচক কর্মসূচিতে। আর বিজেপিকে পরাস্ত করতে হলে যে তৃণমূলদলটাকেই বেছে নিতে হবে, সেটা তাদের বলে দিতে হয়নি।

লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, মমতা ব্যানার্জী কিন্তু হিন্দুত্ববাদের মূল আদর্শ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে বিশেষ মুখ খোলেন নি, বরং তিনিও কম হিন্দু নন, একথাই সোচ্চারে ঘোষণা করেছেন, মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিয়ে বেড়িয়েছেন। এমনকি, এনআরসি-সিএএ নিয়েও বিশেষ কথা বলেন নি, কারণ এগুলো মূলত মুসলিম সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, হিন্দুদের নয়। যদিও মমতার ঘোষিত অবস্থান এনআরসি-সিএএ বিরোধী, কিন্তু তিনি এসব নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেন নি, পাছে হিন্দু ভোট বিপক্ষে চলে যায়। বাস্তবত, কংগ্রেসের মতোই তৃণমূল কংগ্রেসও নরম হিন্দুত্বের পক্ষে, প্রায় সমস্ত সংসদ-সর্বস্ব দলই কমবেশি ধর্মকে রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে।

তাই বিজেপির আদর্শগত বিরোধিতা একমাত্র প্রকৃত বাম শক্তিই করতে পারে, যে শক্তি আদর্শগতভাবে সেকুলার (অর্থাৎ ধর্মের নির্ভরতা-মুক্ত এক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ক্রিয়াশীল)এবং গণতান্ত্রিক (অর্থাৎ সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরোধী)। স্বাভাবিকভাবেই, এই বাম শক্তি পুরনো ধাঁচের দল-কেন্দ্রিক এক বা একাধিক গোষ্ঠীর ঐক্য না হয়ে সম-মনোভাবাপন্ন সকল মানুষের সমবেত কাজের মঞ্চ হতে হবে। বিজেপি-বিরোধী যে সকল মঞ্চ গড়ে উঠেছে, এনআরসি-বিরোধী মঞ্চ থেকে সাম্প্রতিক ‘নো ভোট টু বিজেপি’ প্রচার-মঞ্চ পর্যন্ত সেগুলোর এরকম চরিত্র আছে বলেই এই প্রস্তাব করতে ভরসা পাচ্ছি।

এখন, বিজেপি-বিরোধী এই যে শক্তিগুলোর উদয় হয়েছে, তাদের কাজ তো ফুরিয়ে যায়নি, বরং বলা যায় সবে সূচনা হয়েছে। কারণ গোটা দেশের সাথে সাথে এই রাজ্যেও বিজেপি তথা সংঘ পরিবার ঘাড়ের ওপর নিঃশাস ফেলতেই থাকবে। আর পশ্চিমবঙ্গে বামের ভোট রাম-এ চালান করার প্রক্রিয়ায় বিজেপির ভিত গ্রামবাংলায় নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। পুরনো বামেদের এই গণ-ভিতের গভীরে হিন্দুত্ববাদের শিকড় প্রোথিত হওয়ার আগেই জরুরী ভিত্তিতে তাদের কাছে পৌঁছনো দরকার, সংঘ পরিবারের দলিত-বিরোধী, আদিবাসী-বিরোধী, নারী-বিরোধী মতাদর্শ উন্মোচন করা দরকার।বিজেপি যেহেতু মতাদর্শ-ভিত্তিক একটা দল, তাই বাংলার গ্রাম সমাজের মধ্যে তার মতাদর্শগত শিকড় ছড়াবার আগেই ব্যাপক মানুষের কাছে এদের স্বরূপ উন্মোচন করা দরকার।

আমরা জানি, বিজেপির মতাদর্শ হচ্ছে হিন্দুত্ববাদ তথা হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যা এক অখণ্ড হিন্দু পরিচিতির ওপর দাঁড়িয়ে হিন্দু সংহতি তৈরি করতে চায়, আর সেটা করার জন্য মুসলিম এবং প্রগতিশীল মুক্তমনা মানুষদের বিরুদ্ধে ঘৃণার রাজনীতি প্রচার করে। আরএসএস-এর ওয়েবসাইটে ওদের ‘ভিসন এণ্ড মিশন’-এর সার কথা হল, হিন্দুস্তানে হিন্দু সমাজ ও হিন্দু সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হিন্দু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের আদর্শ ও সংস্কারের ‘শিলীভুত জমির’ ওপর সমাজ-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে পুনর্নির্মাণ করে হিন্দু রাষ্ট্রকে ‘মুক্ত’ করতে হবে। এ এক ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ, যেখানে সনাতন হিন্দু ধর্ম-সংস্কারকে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন করা রাষ্ট্রদ্রোহীতা বলে বিবেচিত।

এই হিন্দুত্ববাদী ভাবাদর্শে অন্য কোনো ধর্ম তো দূরের কথা, এমনকি দলিত, আদিবাসী বা ভাষা-ভিত্তিক জাতি, যেমন বাঙালি, অসমিয়া, ওড়িয়া এসব পৃথক পরিচিতির কোনো স্থান নেই। যারা দলিত বা আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, এদের মতে তাঁরা হিন্দুদের মধ্যে বিভাজন করছেন, তাই তাঁরা দেশদ্রোহী। সে কারণেই সুধা ভরদ্বাজ, আনন্দ তেলটুম্বদে বা স্ট্যান স্মিথের মতো যেসব সমাজকর্মীরা দলিত ও আদিবাসীদের অধিকারের পক্ষে কাজ করে পরিচিত হয়েছিলেন, প্রথম চোটেই তাদের পাঠানো হয়েছে কারান্তরালে।

কিন্তু হিন্দু সমাজ সারা দেশের মতোই পশ্চিমবঙ্গেও নানা জাতপাতে বিভক্ত। গ্রামবাংলায় যেখানে বিজেপি ঘাঁটি গাড়তে চাইছে সেখানে বর্ণ-হিন্দু পাড়া আর নিচু জাতের পাড়াগুলোর অবস্থান ও চরিত্র দুইই আলাদা। ছোট করে বললে, উঁচু জাতের হাতে জমি আছে, চাকরি আছে, ব্যবসা আছে, তাই তাঁরা পাকা বাড়ি, জোতজমি নিয়ে গ্রামের ‘বাবু’ শ্রেণী। আর নিচু জাতের বাস জাত অনুযায়ী নামাঙ্কিত ডোমপাড়া, মাঝিপাড়া, বাউড়িপাড়া বা বাগদিপাড়ায় মাটির বাড়ি আর খড় বা টালির চাল দেওয়া বাড়িতে, যেগুলি অনেকটা পাকা হয়েছে সরকারী আবাস যোজনার কল্যাণে। যেখানে জমিজমা, চাকরি, ব্যবসা কারুর নেই বললেই চলে। এক-আধজন যদি সংরক্ষণের সুবাদে চাকরি জুটিয়ে থাকে, বাবুরা তাদের ব্যঙ্গ করে বলে, ওরা তো এসসি, মানে ‘সোনার চাঁদ’। এদের বেশিরভাগ দিনমজুরি করে দিনযাপন করেন বলে বাবুদের ভাষায় ওরা ‘ছোটলোক’ লেবার ক্লাস।

গ্রামের এই নিম্নবর্ণ মানুষদের সাথে মিল পাওয়া যাবে প্রায় একইরকম ভূমিহীন আদিবাসী ও মুসলিম পাড়াগুলোর। এই পাড়াগুলোই বাবুদের জমি আর বাড়ির কাজে মজুর সরবরাহ করে। ইদানিং নতুন প্রজন্মের ঝোঁক বেড়েছে শহরে বা ভিন দেশে বেশি মজুরির কাজে পাড়ি দেওয়ার। আর তাই বাবুদের আর আগের মতন সস্তায় লেবার মেলে না, ধান কাটা বা রোঁয়ার ভরা মরশুমে লেবার না পেয়ে জমির মালিকরা সংকটে পড়ে। তাই কানপাতলেই শোনা যায় বাবুদের দীর্ঘশ্বাস, আজকাল ছোটলোকগুলো সব লায়েক হয়ে উঠেছে, কাজ করতে চায় না। তাই চাষে আর সুখ নেই।

বাস্তব হল, বর্ণ-হিন্দু জমি ও সম্পদের মালিকদের সাথে গ্রামের ভূমিহীন ও গরিবদের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চিরকালীন, আর এই দ্বন্দ্বই পশ্চিমবাংলার রাজনীতির গতিপ্রকৃতিকে নির্ধারণ করেছে এতকাল। এ রাজ্যে প্রথম যখন সরকার বদল হয়, সেই ১৯৬৭ সালে, কংগ্রেসের বদলে যুক্তফ্রন্ট সরকার, তার পেছনে ছিল সেই চল্লিশের দশক থেকে লাগাতার জমি-বন্টন,ফসলের ন্যায়সঙ্গত ভাগ ও মজুরির দাবিতেএকের পর এক উত্তাল কৃষক আন্দোলন। পুরনো জমিদারদের বিরুদ্ধে তেভাগা আন্দোলন থেকে ষাটের দশকে গ্রামের জমিদার-জোতদারদের সাথে শহরের কালোবাজারি-মজুতদারদের অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে গণ-জাগরণ বাংলায় পট-পরিবর্তনের জমি তৈরি করেছিল। সেইসব আন্দোলনের সূত্র ধরেই ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতায় একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল অধুনা বিলুপ্ত-প্রায় বামফ্রন্ট। আবার ২০০৬ সাল থেকে একের পর জমি আন্দোলন সেই বামফ্রন্টের পায়ের তলা থেকে জমি কেড়ে নিল, গ্রামের খেটেখাওয়া আধা-সর্বহারা মানুষের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আবার পট-পরিবর্তন হল, ক্ষমতায় এল তৃণমূল সরকার।

এই অবধি উত্তর-উপনিবেশিক বাংলার ইতিহাস মোটামুটি একটা সুরে বাঁধা ছিল, বহু উত্থান-পতন সত্ত্বেও গ্রামীণ গরিব মানুষই রাজনীতির মূল ধারাটি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিজেপির উত্থান সেই ছন্দপতন ঘটাতে উদ্যত। ২০১৯ থেকে গ্রামবাংলায় যেহেতু মূলত সিপিআই (এম) দলটি তাদের জনসমর্থনকে বিজেপির পক্ষে চালিত করে, তাই হঠাৎ করেই বিজেপির ভোট ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, আর বামফ্রন্ট তলিয়ে যেতে থাকে। ২০২১ এসে বামেদের এই অতল-যাত্রা সম্পন্ন হয়, কিন্তু তার বিনিময়ে রাজ্য-রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে শিকড় গেঁড়ে বসে হিন্দুত্ববাদী দলটি। নিচের সারণীতে এই পরিবর্তনের ছবিটা ধরা পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে পার্টি-ভিত্তিক প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ:

পার্টি/জোট ২০১১ ২০১৬ ২০১৯ ২০২১
তৃণমূল কংগ্রেস ৩৯ ৪৪.৯ ৪৩.৩ ৪৭.৯
বিজেপি ৪.১ ১০.২ ৪০.৬ ৩৮
বামফ্রন্ট ৩৯.৭ ২৫.৭ ৭.৫ ৫.৯৯
কংগ্রেস ৯.১ ১২.৩ ৫.৬ ২.৯৩

উদ্বেগের বিষয় হল, আজ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বাড়বাড়ন্তের পেছনে রয়েছে কিছুকাল আগেও বামফ্রন্টের সমর্থক নিম্নবর্ণ এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশের সমর্থন, আর স্বাভাবিকভাবেই এর বিপরীতে সংহত হয়েছে বিপন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। গ্রামবাংলার নব বিভাজনের এই ছবিটা শ্রেণী-ভিত্তিক মেরুকরণকে চূরমার করে ধর্মভিত্তিক মেরুকরণের পথ প্রশস্ত করেছে। গ্রামের পুরনো বাম নেতারা হয়েছে বিজেপির প্রধান স্তম্ভ, তৃণমূল দলের ওপর অসীম ঘৃণা যাদের চালিত করেছে তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানের একেবারে বিপরীত মেরুতে। তৃণমূলের কিছু দলছুট নেতা বিজেপিতে গিয়ে এই বিভাজন আরও তীব্র করেছে। যে নন্দীগ্রামে মাত্র ১০-১১ বছর আগে হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে জমি-অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে জীবন-মরণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন, সেখানকার ছবিটা আজ বিপজ্জনকভাবে দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে গেছে। আর এটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ডেকে এনেছে ঘোর অমানিশা।

কিন্তু বঙ্গ-রাজনীতির এই ক্রান্তিকালে একটা রুপালী রেখা আছে। এই যে গরিব মানুষগুলো বিজেপিকে সমর্থন করেছেন, তাদের মধ্যে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রভাব এখনো সামান্য, আরএসএস-এর শাখা এখনো গ্রামেগঞ্জে বিশেষ গজিয়ে ওঠেনি। সংঘ পরিবার আগামী দিনগুলোতে তাদের ঘর গোছাবে, গ্রামীণ গরিব-মধ্যবিত্তদের মধ্যে শাখা-সংগঠন বিস্তার করে, তাদের আদর্শগত প্রশিক্ষণ দিয়ে ঘৃণার চাষ শুরু করবে। তার আগেই যদি তাদের কাছে পৌঁছনো যায়, যদি বিজেপির আসল চেহারাটা খুলে ধরা যায়, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম-নিধনের পাশাপাশি দলিত-আদিবাসী-নারী লাঞ্ছনার ধারাবাহিক ইতিহাস যদি উন্মোচন করা যায়, তাহলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের এক বিপর্যয়কারী ভবিষ্যৎ থেকে পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

আর এই কাজের মধ্যে দিয়ে উদীয়মান বাম ও প্রগতিবাদী শক্তি যদি নিম্নবর্গের সংহতি গড়ে তুলতে পারে, যে কাজ মোটেই সহজ নয়, এবং সেই প্রক্রিয়ায় সমাজে ক্রিয়াশীল সকল সেকুলার ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে সংহত করতে পারে, তবে এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্যরকম কোনো পথে মোড় নিলেও নিতে পারে।

  • লেখক  গবেষক,  গণ আন্দোলনের কর্মী
  • মতামত লেখকের নিজস্ব

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on পুরাতন বাম মৃত, দীর্ঘজীবী হোক নতুন বাম

Leave A Comment