গুজরাত মডেলের আসল চিত্র

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 6 months by admin

(পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বারবার উঠে আসছে গুজরাট মডেলের কথা। বিজেপি নেতারা তাঁদের বক্তৃতায় প্রায়ই তুলে ধরছেন গুজরাট মডেলের নাম। গুজরাট নাকি উন্নয়নের স্বর্গরাজ্য! গুজরাটে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবেতেই উন্নয়নের এক বিশাল মডেল। সত্যিই কি তাই?  …… লিখছেন – তরুণ মিত্র)

গুজরাত মডেলের আসল চিত্র

তরুণ মিত্র

 

অনেক অর্থনীতিবিদ তাঁদের লেখায় বারবার গুজরাট মডেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় উঠে এসেছে যে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের সাহায্য দিয়েছে গুজরাট সরকার, তারপর গুজরাট সরকার জনসাধারণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানের জন্য বছরের পর বছর বাজেটে সীমিত তহবিল ধার্য করেছে। তাতে সাধারণ মানুষ সরকারী পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে নলে তাদের বক্তব্য।

গুজরাটের মডেল কী? সরল ভাষায়, এটি ২০০২-০৩ থেকে ২০০১১-১২ সময়কালকে বোঝায় যেখানে গুজরাট তার ‘বৃদ্ধি’র হারে সাংখ্যিক উলম্ফন ঘটিয়েছিল বলে গুজরাট মডেলের প্রবক্তাদের মত। তার চালিকাশক্তি ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নব্য উদারীকরণ (নিও লিবারাল) নীতিগুলি।

 

তখন এই আর্থিক বৃদ্ধির তিনটি প্রধান উপাদান ছিল: কর্পোরেট বিনিয়োগকে টানার জন্য পরিকাঠামোগত উন্নয়নে লাফ; কর্পোরেট সংস্থাগুলির প্রয়োজন মেটাতে প্রশাসনের উদগ্র বাসনা; বিনিয়োগকে আকর্ষণ করার জন্য কর্পোরেট খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উত্সাহ ভাতা ও ভর্তুকি প্রদানে অবাধ আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য রাস্তা, বিমানবন্দর এবং বিদ্যুতের উপর সরকার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল – নানা সংস্কারের মাধ্যমে উপরিকাঠামোর বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল কর্পোরেট সংস্থাগুলির প্রয়োজন মেটাতে। এছাড়া তাদের জন্য ২৪ ঘন্টা বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিল প্রায় নিখরচায়।

প্রশাসন একক জানালা পদ্ধতিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দ্রুত নিষ্পত্তি ঘটিয়েছিল। ব্যাংক ঋণের সহজ ব্যবস্থা করে দিয়েছিল এবং প্রয়োজনে কর্পোরেট সংস্থা এবং তাদের কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও পরিষেবাগুলিতে মনোনিবেশ করেছিল। বিনিয়োগের প্রবাহকে সহজ করার জন্য পদ্ধতিগুলি ত্বরান্বিত করতে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছিল তখনকার গুজরাট সরকার। রাজ্য সরকারগুলির আয়ের প্রধান উত্স – বিক্রয় কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের চল্লিশ শতাংশ তাও ছেড়ে  দিয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর গুজরাট।

এরপরেও গুজরাট সরকার মূলধন, সুদ, পরিকাঠামোগত সহায়তার পাশাপাশি কর্পোরেটদের জন্য ভূমি, জল সরবরাহ ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভারী ভর্তুকি চালু করে। বৃহত্তর বিনিয়োগের জন্য ভর্তুকির হার বেশি ছিল। বৃহৎ শিল্পের জন্য, কোনও নির্দিষ্ট হার ছিল না এবং প্রতিটি ক্ষেত্রকে আলাদা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হত। উদাহরণস্বরূপ, টাটা-ন্যানো সম্পূর্ণ ৩০০০০ কোটি টাকার ভর্তুকি পেয়েছে (যেমন সুজুকি, হুন্ডাই ইত্যাদি)। কর্পোরেটদের জন্য দেওয়া জমিগুলি সাধারণ চারণভূমি ছাড়াও ছিল সংরক্ষণযোগ্য অঞ্চল, জাতীয় উদ্যান এবং সেচযুক্ত উর্বর জমি। একর প্রতি দাম ১ টাকা থেকে শুরু হয়েছিল, এবং গুজরাটের উন্নয়ন মডেলের শেষ বছরগুলিতে জমির দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল তবে বাজারের দামের চেয়ে তা অনেক কম ছিল।

 

বিশ্বব্যাপী বাজারগুলি প্রসারিত হওয়ায় এই বৃদ্ধি আরো ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য সাহায্য করেছিল। গুজরাট সমস্ত বড় শিল্প থেকে রফতানি বাড়িয়ে দিয়েছিল: পেট্রোকেমিক্যাল-্রাসায়নিক, ওষুধ-ড্রাগস, বস্ত্র ও পোশাক, চামড়া, মেশিন যন্ত্র এবং ইলেক্ট্রনিক্স, রত্ন ও গহনা, এবং ‘উন্নত-আধুনিক’ কৃষি ফসল। এগুলি করেছিল কয়েকটি এসইজেড ও শিল্প উদ্যান তৈরি করে এবং বিশেষ রফতানির ব্যবস্থা করে।

প্রায় নয় বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ভাল বৃষ্টিপাতের ফলে ‘উন্নত’ বীজের চাষ ভালো হওয়া এবং ‘উন্নত’ বীজের (বিটি তুলা প্রধান ছিল) বিষয়ে সরকারের নীতিমালা, কৃষি রথের মাধ্যমে প্রচার ও কৃষিকাজের জন্য ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ আধুনিক কৃষির প্রসারণে সাহায্য করেছিল। এই সময়ে গুজরাটে ‘উন্নত-আধুনিক” কৃষির বৃদ্ধি (৭-৮%) ঘটিয়েছিল।

তবে, ২০১১-১২ এর পরে, খরা এবং জলের সংকট এই হারকে কমিয়ে ৩.৭% এ নিয়ে গেছে। এ ছাড়া, কৃষিজ ফসলের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য না হওয়া, দরিদ্রের ফসল বীমা ঠিক মতো না থাকায় কৃষিজ ক্ষেত্রে বৃদ্ধি আর হয় নি। কারণ চাষের ব্যয় অনেক বেশি ছিল।  এছাড়া এই বৃদ্ধি টেকসই ছিল না। যথেচ্ছ ভূগর্ভস্থ জলের, সেচের ফলে জলের সংকট দেখা যায়। সরকারের কাছ থেকে প্রান্তিক কৃষকরা খুব বেশি সুবিধা পাননি। কৃষির মজুরিও কমে গিয়েছিল। এসবের ফলে কৃষির যে আপাত বৃদ্ধি তা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়।

কর্পোরেট বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির বৃদ্ধিতে এই উল্লম্ফনের সামগ্রিক প্রভাব কী ছিল?

কর্পোরেট ইউনিটগুলিকে বিশাল উত্সাহ ভাতা দেওয়ার পরে, জনসাধারণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের বাজেটে সীমিত তহবিল পড়ে ছিল। গুজরাট তার আয়ের ২% এরও কম শিক্ষায় ব্যয় করেছে (আদর্শ হত ৫-৬%) এর ফলস্বরূপ যে গুজরাটে ৪৫% শ্রমিক নিরক্ষর বা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা। অন্যদের পড়ার মানও খুব নিম্নমানের ছিল। উচ্চশিক্ষার মানও খারাপ। ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞান স্নাতকদের  বেকারত্বের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। স্বাস্থ্যের জন্য জনসাধারণের ব্যয় রাজ্য বাজেটের ০.৮%, (৪-৬% এর আদর্শের অনেক নিচে)। গুজরাট প্রায় সকল স্বাস্থ্য সূচকে খুব দ্রুত নীচে নেমে গেছে। রাজ্যে ৪৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার এবং মাতৃত্বকালীন পুষ্টি উপেক্ষিত; তাই দে সময় মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে রাজ্যের দুর্বল অবস্থানকেই চিহ্নিত করেছে।

গুজরাটে মাত্র ৬.৮% শ্রমিকই আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের। প্রায় ৯৩-৯৪% শ্রমিকের আয় খুব কম এবং  সামাজিক সুরক্ষা সহ অন্যান্য সুবিধা প্রায় নেই। গত দশক বা তারও বেশি সময় ধরে গুজরাটে মজুরির হার ভারতের প্রধান রাজ্যগুলির মধ্যে প্রায় সর্বনিম্ন। “অত্যাধুনিক” প্রযুক্তির পিছনে পিছনে এই প্রবৃদ্ধি চূড়ান্তভাবে নিবিড় হয়েছে। উত্পাদন ক্ষেত্রের বৃদ্ধির সাথে কর্মসংস্থানের কোনো সামঞ্জস্য নেই। কর্মসংস্থান ধাক্কা খেয়েছে। রাষ্ট্রের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হ’ল যুবকদের জন্য উপযুক্ত আয়ের সাথে ব্যাপক উত্পাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। গুজরাটে চলমান আন্দোলনগুলি এই ব্যর্থতাকেই দেখিয়ে দিয়েছে।

 

 

গুজরাটে ৪০–৪৫% পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য (কৃষিকাজ, পশুপালন, দুগ্ধ, বনজ, মৎস্য চাষ ইত্যাদি) প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল। ভারী শিল্প ও উপরিকাঠামোর উন্নয়নের থেকে দূষণের সাথে সাথে প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। তাই প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনে দুর্দশা নেমেছে। দেখা যাচ্ছে আদিবাসী জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাদের হাজার হাজার মানুষকে শহুরে রাস্তায় অস্থায়ী ছাউনিতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বা গ্রামীণ অঞ্চলে অস্থায়ী কুঁড়েঘরে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। এসব জায়গায় তাদের কোন মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নেই; এমনকি প্রাতঃক্রিয়া করার জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। আশ্চর্যের বিষয় এই যে গুজরাট হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে প্রায়শই বলেছিল যে তারা যেন ভুলে না যায় যে আদিবাসী জনজাতিও রাজ্যের জনসংখ্যার একটি অংশ। কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত করেনি গুজরাট সরকার।

নেট ফলাফল ৪০% জনসংখ্যা বহুমাত্রিকভাবে দারিদ্র্যসীমার নীচে রয়ে গেছে। উন্নয়ন শুধুমাত্র উপরের স্তরে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকাদের জন্য, সাধারণ মানুষের কাছে এর ছিটেফোঁটাও পৌঁছায় না। যদিও বেশ কয়েকটি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য কর্মসূচী আছে –দরিদ্র মানুষের জন্য, তবে তার বাস্তবায়ন খুব খারাপ। সংক্ষেপে, গুজরাটের মডেলকে ঘিরে তৈরি প্রচারটি ফাঁপা এবং ভুয়ো।

 

সূত্র : অধ্যাপক ইন্দিরা হিরওয়ে (আহমেদাবাদের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভস (সিএফডিএ) এর অর্থনীতি বিভাগের ডাইরেক্টর), অর্থনীতিবিদ মৈত্রেশ ঘটক ও সঞ্চারী রায়ের “গুজরাট মডেল” নিয়ে  EPW ও The Wire –এ নানা লেখা ।

 

  • মতামত বিভাগের সমস্ত মত লেখকের নিজস্ব
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on গুজরাত মডেলের আসল চিত্র

Leave A Comment