চলমান কৃষক আন্দোলনের হাল হকিকত : পর্ব – ৩

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর

Last Updated on 1 month by admin

 

বিশেষ প্রতিবেদন, ২৫ অক্টোবর, ২০২১ :

(দেশজুড়ে চলমান কৃষক আন্দোলনের প্রতি সপ্তাহের আপডেট দেওয়া হবে এই বিশেষ সিরিজের প্রতিবেদনে। এই আন্দোলনের ব্যাপ্তির নিরিখে এরকম যেকোনও প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু চেষ্টা করা হবে বিগত সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে যথাসম্ভব তুলে ধরার। প্রতি সোমবার আমরা তুলে ধরবো আগের সপ্তাহের খবরাখবর। এ সপ্তাহে আগের  সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ কিছু খবর দেওয়া হল।)

পর্ব – ৩

আগামী ২৬ অক্টোবর.২০২১-এ ১১ মাস সম্পূর্ণ করছে কৃষক আন্দোলন। সাপ্তাহিক হাল হকিকতের পাশাপাশি প্রথমেই মনে করে নেওয়া যাক কৃষক আন্দোলনে কৃষকদের প্রধান কিছু দাবি  :

উৎপাদিত শস্যের লেনদেন আইনের প্রত্যাহার – এই আইনের আওতায় এ.পি.এম.সি.-গুলির, এবং ফলতঃ ফসলের নূন্যতম দামের (এম.এস.পি.),  নির্মূল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখানে বলে রাখা দরকার যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষি চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের এমএসপি প্রকল্প আন্তর্জাতিক মোকদ্দমার সম্মুখীন হতে পারে। এর কারণ হল যে কোন দেশের মূল্য সুরক্ষা-ভিত্তিক ফসলের কেনাকাটা বিশ্ববাণিজ্যে ফসলের দাম ওঠানামার পরিপন্থী। ৩০ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর ২০২১ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১২ তম মন্ত্রিসভার সম্মেলনে, জি -৩৩ এর প্রতিনিধি হিসেবে ভারত  কঠোরভাবে এম.এস.পি. -র মতো প্রকল্পকে বিশ্বের দরবারে সমর্থন করবে বলেছে। এম.এস.পি. এবং  খাদ্য সুরক্ষার খাতে সরকারি শস্য সংগ্রহ একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারত নিশ্চিত করতে চায় যে এ বিষয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ভবিষ্যতে যেন কখনও হস্তক্ষেপ না করতে পারে। (এর আগে ২০১২ সালে চিনের সরকারি শস্য সংগ্রহ প্রকল্পের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র মামলা দায়ের করেছিল এবং ওখানকার একটি অনুরূপ প্রকল্প বন্ধ করতে সফল হয়েছিল। ২০১৩ থেকে তাই একটি মৌখিক চুক্তি আছে যে খাদ্য সুরক্ষা খাতে শস্যের সর্বনিম্ন দাম সুনিশ্চিত করে সংগ্রহের বিষয়ে কোনো দেশকে প্রশ্ন করা চলবে না, কিন্তু এই চুক্তি মৌখিক এবং সেই কারণে অস্থায়ী।) অন্যথায়, সরকারের উচিত অন্যান্য  সমাধানগুলিকে  গুরুত্ব সহকারে দেখা, যেমন কৃষকদের জন্য একটি উপযুক্ত সার্বজনীন নূন্যতম আয়ের নিশ্চয়তা।  প্রধানমন্ত্রী কৃষক সম্মান নিধি দরিদ্রতম কৃষকদের জন্য মাসে মাত্র ৫০০টাকা নিশ্চিত করে, যা বাজারদরের তুলনায় খুবই সামান্য । এই স্থিতাবস্থা আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।

মূল্য নিশ্চয়তা এবং চুক্তিচাষ আইনের প্রত্যাহার — মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া না থাকার  মানেই মূল্য শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের কোন সুরক্ষা না থাকা। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষকদের পক্ষে বড় কর্পোরেট সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো অসম্ভব ব্যাপার। এভাবে কৃষকরা তাদের জমি হারাতে পারে।

(সংশোধিত) অপরিহার্য খাদ্যদ্রব্য আইনের প্রত্যাহার – বেশ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য অপরিহার্য খাদ্যের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অর্থাৎ এই সমস্ত খাদ্যের সরবরাহের দায়িত্ব থেকে সরকার নিজেকে মুক্ত করে নিচ্ছে এবং বড় বড় ফড়েদাররা, আড়ৎদাররা আইনের চোখে বৈধভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার খাদ্য মজুত করে বাজারে চড়া দামে বিক্রি পারবে। উঠে যাবে রেশন ব্যবস্থা।

এই সব নিয়ে গত ১১ মাস কৃষকরা দিল্লির বিভিন্ন সীমান্তে অবস্থান করছেন। গোটা দেশের প্রায় সব কটা রাজ্যে আন্দোলনে সামিল হয়েছেন কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র-যুবরা। এমনকি বিভিন্ন রাজ্যের ভোটে এর প্রভাবও পড়েছে। এবার গত সপ্তাহের ঘটনাগুলি দেখে নেওয়া যাক –

১৯ অক্টোবর এক সাংবাদিক সম্মেলন করে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা। ১৮ অক্টোবর দেশজুড়ে রেল রোকো সফল করার জন্য সারা দেশের কৃষকদের, শ্রমিকদের ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে ধন্যবাদ দেন সংযুক্ত কিষান মোর্চার তরফ থেকে রবি আজাদ। তিনি বলেন যে সরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে এবং প্রকৃত হত্যাকারীদের শাস্তি দিতে হবে। তবেই শহীদ কৃষকদের প্রতি সুবিচার হবে। তিনি জানান যে সরকার এখন কৃষকদের শরণার্থি বানিয়ে দিয়েছে। গত প্রায় এক বছর জুড়ে কৃষকরা এক ঐতিহাসিক লড়াই লড়ে চলেছে। তিনি আরো বলেন যে  কালা কৃষি আইন বাতিলের লড়াই যেন আজ এক নতুন স্বাধীনতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এই লড়াই কৃষকরা জিতবেন। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্র সরকার আজ কৃষক আন্দোলন ধ্বংস করতে ষড়যন্ত্র করছে।

২০ অক্টোবর আলনাবাদ বিধানসভা এলাকায় লখিমপুর খিরিতে মৃত কৃষকদের অস্থি কলস যাত্রা করা হয়। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার (এসকেএম) সদস্য লাখবিন্দ্র সিং-এর নেতৃত্বে আস্থি কলস যাত্রা আউলাখ, তালওয়াদা, থবরিপা, মির্জাপুর, অমৃতসর, প্রতাপনগর, বুঢিমেদি, মৌজুখেড়া, আলপাত্তি, হিমায়ুখেদা,  কুট্টাবাধ, কোটলি, কেসুপুরা, মাল্লেকান থেকে আলনাবাদ শহরে আসে। আলেনাবাদ উপনির্বাচনে কৃষকদের খুনিকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চের নেতা সুরেশ কৌথ। বিজেপি-জেজেপি প্রার্থীকে সম্পূর্ণ বয়কটের করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিজেপি ও জেজেপি দলকে ভোট না দিয়ে – তাদের বর্জন করে কৃষক শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর আবেদন করেন।

২১ অক্টোবর হরিয়ানার মহেন্দ্রগড় জেলার আতেলি বাজারে সার না পেয়ে বিপর্যস্ত কৃষিজীবি মানুষ বিক্ষোভ দেখান।

২২ অক্টোবর সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা র নেতৃত্বে বিহারের সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা ‘কিষাণ বাঁচাও স্বাভিমান যাত্রা’ শুরু করেন। বিহারের প্রায় সব জেলায় সফর কর্মসূচির মাধ্যমে সচেতনতা প্রচার করা হবে বলে জানিয়েছেন বিহারের কৃষক নেতৃত্ব।

একই দিনে লখিমপুর খিরির কৃষক শহীদদের অস্থি নিয়ে পাঞ্জাবের দোয়াবায় সংঘর্ষ যাত্রা করেন কৃষক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই যাত্রায় অংশ নেন।

কীর্তি কিষাণ ইউনিয়নের রামিন্দর সিং পাটিয়ালা স্কটল্যান্ডে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে আহ্বান জানান কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করার জন্য এবং আগামী ৩১ অক্টোবর নরেন্দ্র মোদীর স্কটল্যান্ড সফর কালে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য। এদিন প্রবাসী ভারতীয়রা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে জানিয়েছেন যে তাঁরা ভারতের কৃষক আন্দোলনের পাশে আছেন।  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্কটল্যান্ড সফরের সময় তাঁরা প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এজন্য স্কটল্যান্ডের কিষাণ মোর্চা সমর্থকদের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান এসকেএম নেতা নির্ভাই সিং ধুদিকে।

২৩ অক্টোবর লাচোয়াল টোল প্লাজা হোশিয়ারপুরে শহীদ কৃষকদের সংঘর্ষ যাত্রা।ধানসা বর্ডারেও একই কর্মসূচি নেন কৃষকরা। অস্থি কলস যাত্রা হয় পাঞ্জাবের দাসুয়ায়।

মান্ডিতে সহায়ক মূল্যে ধান কেনার দাবিতে উত্তরপ্রদেশে বিভিন্ন জায়গায় কৃষকরা বিক্ষোভ দেখান। এদিন লখিমপুরে কয়েকজন কৃষক ন্যায্য দামে ধান বিক্রি না হওয়ায় ধান জ্বালিয়ে দেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

জম্মু-কাশ্মীরের কৃষক ফার্মের প্রেসিডেন্ট, সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার সদস্য হামিদ মালিক শ্রীনগরে কৃষকদের এক কর্মসূচিতে কৃষক আন্দোলন জোরদার করার আওয়াজ তুলেছেন।

২৪ অক্টোবর বরনালার কৃষক মান্ডিতে কৃষকদের জমায়েত। পরিকাঠামো নির্মাণে  মান্ডির যে অর্থ ব্যবহার করার কথা তা কোথায় যায় – এই প্রশ্ন নিয়ে কৃষকরা বিক্ষোভ দেখান। এবার বৃষ্টিতে কৃষকদের ফসল নষ্ট হয়েছে তারজন্য মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিং চানির কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানান কৃষকরা। শুধু পাঞ্জাবে নয় গোটা উত্তর ভারতের অনেক জায়গায় শিলাবৃষ্টির কারণে কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তার জন্য সংশক্লিষ্ট রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা।

২৫ অক্টোবর পাঞ্জাবের কৃষকরা মান্ডিতে ন্যুনতম সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রির দাবি জানান। কৃষকরা বলছেন, রাজ্য জুড়ে মাণ্ডি বিস্তৃত এবং তা এমএসপি এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়ার সাথে নিরাপত্তা প্রদান করে – এবং তাঁরা আশঙ্কা করছেন যে নতুন কৃষি আইন দ্বারা এগুলি ভেঙে দেওয়া হবে।

এদিন সংযুক্ত কিষান মোর্চা উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে কৃষকদের নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্রী অজয় ​​মিশ্র টেনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে  এক চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং মন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on চলমান কৃষক আন্দোলনের হাল হকিকত : পর্ব – ৩

Leave A Comment