চলমান কৃষক আন্দোলনের হাল হকিকত : পর্ব – ২

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর

Last Updated on 1 month by admin

বিশেষ প্রতিবেদন, ১৮ অক্টোবর, ২০২১ :

(দেশজুড়ে চলমান কৃষক আন্দোলনের প্রতি সপ্তাহের আপডেট দেওয়া হবে এই বিশেষ সিরিজের প্রতিবেদনে। এই আন্দোলনের ব্যাপ্তির নিরিখে এরকম যেকোনও প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু চেষ্টা করা হবে বিগত সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে যথাসম্ভব তুলে ধরার। প্রতি সোমবার আমরা তুলে ধরবো আগের সপ্তাহের খবরাখবর। এ সপ্তাহে আগের  সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ কিছু খবর দেওয়া হল।)

পর্ব – ২

 

১১ অক্টোবর: মধ্যপ্রদেশের সার সরবরাহে ঘাটতির দেখা দিয়েছে।  অনেক জায়গায় স্থানীয় প্রশাসন রবি মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এর পরিবর্তে ইউরিয়া সরবরাহ করছে।  এছাড়াও, সারের দাম প্রায় ৫০শতাংশ বেড়ে গেছে।

স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা দেখে কৃষকরা বিষয়টি  নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন।  গোয়ালিয়র-চাম্বল অঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ ও রাস্তা অবরোধ হয়েছে।  কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমরের সাবালগড়ের নির্বাচনী এলাকায়, কৃষকরা সার পরিবহনকারী লরি অপহরণের মতন চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন।  এই ঘটনার পরে, কেন্দ্রীয় সরকার ডায়ামোনিয়াম ফসফেটের জন্য অতিরিক্ত  ৫৭০০ কোটি টাকার ভর্তুকি ঘোষণা করেছে।

রাজস্থানের হনুমানগড়ে কৃষকদের উপর লাঠি চার্জ করার বিরুদ্ধে ১১ অক্টোবর জেলা শাসকের অফিসের সামনে কৃষকের প্রতিবাদ অবস্থান কর্মসূচী চলে। নেতৃত্বে ছিলেন কৃষক নেতা রঞ্জিত সিং রাজু সিহ রজস্থানের কৃষক নেতারা।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ি ১২ অক্টোবর সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতৃত্বে দেশজুড়ে কৃষক শ্রমিকদের প্রতিবাদ কর্মসূচী পালিত হয়। উল্লেখ্য মোর্চার নেতৃত্ব গত ৯ অক্টোবর ঘোষণা করেছিলেন যে কৃষকদের দাবিগুলি ১১ অক্টোবরের মধ্যে সরকার না মেনে নিলে মোর্চা সারা দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করবে। দাবী ছিল তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় সিং টোনির পদত্যাগ ও কৃষক হত্যাকারিদের উপযুক্ত শাস্তি।

১২ অক্টোবর: লখিমপুর খেরির ঘটনায় মৃত কৃষকদের জন্য ঘটনার এক কিলোমিটার দূরে একটি অন্তিম প্রার্থনা আয়োজিত হয়।  অনুষ্ঠানে কৃষক নেতাদের বক্তব্য রাখার জন্যে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে  প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মতো রাজনৈতিক নেতারা অংশগ্রহণ করতে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁদের মঞ্চে স্থান দেওয়া হয়নি। এই  অনুষ্ঠানে বিভিন্ন আঞ্চলিক কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধেও  প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়েছিল। অর্থাৎ কৃষক আন্দোলন যে কোনো রাজনৈতিক প্রশাসনকেই দায় এড়িয়ে যেতে দেবে না তা আবারও পরিষ্কার হয়ে গেলো।

১৩ অক্টোবর: সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে মার্কিন সফর চলাকালীন  হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলে লখিমপুর খেরির ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। প্রশ্নকর্তা ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে জিজ্ঞাসা করেন এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কেন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর উত্তর সরাসরি এড়িয়ে গিয়ে শ্রীমতি সীতারামন বলেন যে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকার থাকা কারণে এই ঘটনাটির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিকারক তিন কৃষি আইন প্রসঙ্গে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন এই বিল সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট সমালোচনা কৃষকদের কাছ থেকে শোনা যায়নি। অথচ গত নমাসের আন্দোলনের পরে একজন সাধারণ দেশবাসীও এই আইনের ক্ষতিকারক দিকগুলির ব্যাপারে অবহত। এই সিরিজে ভবিষ্যতে আমরা আবারও এই বিষয়ে আলোচনা লিখবো।

১৩ অক্টোবর: উত্তরপ্রদেশ আইনমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক লখিমপুরের হিংসাত্মক ঘটনায় নিহত বিজেপি কর্মী এবং কৃষক আন্দোলনের উপর গাড়ি চালিয়ে দিয়েছিলেন যিনি, সেই অজয় মিশ্রের নিহত গাড়ি চালকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে লখিমপুর খেরিতে গিয়েছিলেন। অথচ অজয় মিশ্রের কনভয়ের  চাকায় নিহত কৃষকদের পরিবারের সঙ্গে তিনি দেখা করেননি।

কেরালার তিরুবনন্তপুরমে কৃষকদের পদযাত্রা। রাজভবনের সামনে পদযাত্রার শেষে অবস্থান ও সভা।

১৪ অক্টোবর: এই বছরের শুরুতে কৃষকরা উৎপাদন শুরু করে দেওয়ার পরে হঠাৎ কেন্দ্রীয় সরকার তৈলবীজ এবং ভোজ্য তেল কেনার উপর সীমা ধার্য করে দেয়। এর ফলে তেলের বাজারের নির্ভরযোগ্যতা কমতে পারে ও তেল ব্যবসায়ীরা কম তেল কেনার ফলে তেলের দাম বাড়াতে পারে।  এখন বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের নামে সরকার কার্যত ভোজ্যতেলের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দিয়েছে। এর উপর আগামী ৩১ শে মার্চ, ২০২২ পর্যন্ত তেল ব্যবসায়ীদের কোন বিক্রয় শুল্ক দিতে হবেনা। কোন প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের এই ধরণের খোলা আমন্ত্রণ ভারতীয় তেলচাষীদের আগামী খরিফ অধিবেশনের তেল বাজারে ব্যাপক মন্দার মুখে ফেলবে। এই চরম কৃষক বিরোধী পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা।

১৫ অক্টোবর: সিংহু সীমান্তে আন্দোলন থেকে বেশ অনেকটা দূরে একটি হত্যাকান্ড হয়। অবিবেচক  মূলধারার সংবাদ মাধ্যম দ্রুত এই ঘটনাটিকে কৃষক বিক্ষোভের সাথে যুক্ত করে।  কেউ যদি এদের খবরের শিরোনামটুকু পড়েন, তাহলে মনে হবে কৃষকরা কোন না কোনভাবে জড়িত। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শাখাকে কৃষক আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিষাণ মহাপঞ্চায়েত রাজস্থান হাইকোর্টে মামলা করেছে, যা ক্ষতিকারক তিন কৃষি আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এরই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে তারা জন্তর -মন্তরে বিক্ষোভ করার অনুমতি চেয়ে একটি মামলা করেন।  সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ আবেদনকারীদের কৃষক আন্দোলনে সামিল হওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য আবেদনকারীরা নিজেদের পক্ষে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। অথচ এর আগে একটি মামলায় (জে. আর. পরাশর বনাম প্রশান্ত ভূষণ) সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে বিচারকদের কাজ আইন অনুযায়ী বিচার করা, জনমতের প্রেক্ষিতে নয়।

১৬ অক্টোবর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশ জুড়ে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ-আদিত্য যোগী সহ কৃষক বিরোধী নেতাদের কুশপুতুল দাহ করা হয়। দাসুয়া হাজিপুর চকে আজাদ কিষাণ কমিটি মোদি শাহ যোগীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

লখিমপুর সহ আন্দোলনে শহীদ কৃষকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে তালু গ্রামের যুবকরা টিকরি ধামে মশাল যাত্রা করেন।

এদিন শহীদ কিষাণ যাত্রার কো-অর্ডিনেটর জগতার সিং বাজওয়া  শহীদ কৃষকদের অস্থি কলস নিয়ে দেরাদুনের পৌঁছে এক সভা করেন। সেখানে জগতার সিং বাজওয়া বলেন সারা উত্তরাখন্ডের কৃষকরা শহীদ কৃষক যাত্রায় অংশগ্রহণ করবেন।

এদিন হরিয়ানার রোহতকে কিষাণ মহা পঞ্চায়েত হয়। এই মহা পঞ্চায়েত পরিচালনা করেন ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন চাধুনির জাতীয় সহ সভাপতি দলিত নেতা কান্তা আলাদিয়া।

এদিনই ভোর ৪.৩০ মিনিটে বড় ঘটনা ঘটে যায়| হরিয়ানার কৃষকের বস্তিতে আগুন লাগে | কৃষক নেতাদের দাবী এই ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে বিজেপি দল ও হরিয়ানা প্রশাসনের হাত রয়েছে। এই ঘটনায় কৃষকদের ঘর বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কৃষক নেতৃত্ব বলেন, “সরকার বার বার কৃষকদের প্রতিবাদকে অপমান করতে চায়, তাই এরকম ঘটনা ঘটাতে মদত দেয়।“

১৭ অক্টোবর কৃষক বাঁচাও দেশ বাঁচাও পদযাত্রা হয় উড়িষ্যার নুয়াপ্রা জেলায়। হাজার হাজার কৃষক এই পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।

এদিন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার তরফ থেকে ১৮ অক্টোবরের (সোমবার) ‘রেল রোকো’ কর্মসূচী সফল করার আহ্বান জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর উত্তরপ্রদেশ সফরের আগে যোগী সরকারের পুলিশ বারাণসী জেলায় গত কয়েকদিন ধরে কৃষক নেতাদের গৃহবন্দী করে রেখেছে। তার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন কৃষক মোর্চার নেতৃত্ব।

১৮ অক্টোবর সারা দেশে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার আহ্বানে রেল রোকো কর্মসূচী পালন করে বিভিন্ন কৃষক – শ্রমিক সংগঠন ও তাদের সহযোগীরা। দাবী কেন্দ্রীয় সরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে ও লখিমপুর খেরির কৃষক হত্যার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং কৃষকদের হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।

এদিন পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও রাজধানী দিল্লী সহ দেশের প্রায় সব কটি রাজ্যে ‘রেল রোকো’ করেন কৃষক শ্রমিক সহ ছাত্র-যুবরা। এই কর্মসূচীকে ঘিরে অনেক জায়গায় পুলিশের সাথে বাগ বিতন্ডাও হয়। মধ্যপ্রদেশের রেওয়াতে বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার করে পুলিশ।  রেল দপ্তর সুত্রে জানা গেছে যে‘রেল-রোকো’র জেরে বাতিল করা হয়েছে, অনেক ট্রেন।

কৃষকদের ডাকা রেল-রোকো কর্মসূচী ব্যর্থ করতে উত্তরপ্রদেশে ১৪৪ ধারা জারি করেছিল মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার। এমনকি, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইনে’ মামলা রুজু করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। সেই হুঁশিয়ারি অমান্য করে সোমবার সকাল থেকে বিভিন্ন রেলস্টেশনের কাছে রেললাইনে বসে পড়েন কৃষক ও অন্যান্য সমর্থক সংগঠনের কর্মীরা।

পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় রেলরোকো হয়। বনগাঁ, আসানসোল, দুর্গাপুর, কোচবিহার সহ বিভিন্ন জেলায় রেল-রোকো হয় সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে।

সযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতৃত্ব সারা দেশে এই রেল রোকো কর্মসূচী সফল করার জন্য আন্দোলনকারীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। মোর্চার নেতৃত্ব বলেছেন, “ বহু জায়গায় রেল অবরোধ করার জন্য কৃষকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ সরকার যাদের গ্রেপ্তার করার কথা, শাস্তি দেওয়ার কথা সেই হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করছে না। তাদের গ্রেপ্তার করলে আমাদের আজ এই কর্মসূচী নিতে হত না।“

কৃষক আন্দোলনের দিকে নজর গোটা দেশের। কৃষক তাঁদের দাবী আদায় করে বাড়ি ফিরবেন – একথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন কৃষকরা। এখন সরকার কৃষকদের দাবী মানেন কিনা সেটাই দেখার অপেক্ষায় সারা দেশ।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on চলমান কৃষক আন্দোলনের হাল হকিকত : পর্ব – ২

Leave A Comment