কেন্দ্রের ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের ‘চৌকিদারিতে’ চুরি গেল দেশের মানুষের ভ্যাকসিনও

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 4 months by admin

কেন্দ্রের ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের ‘চৌকিদারিতে’ চুরি গেল দেশের মানুষের ভ্যাকসিনও

ইন্দ্রানী পাল

সম্প্রতি বিদেশের একটি নিউজ ব্লগ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পাঁচজন প্রেসিডেন্টের একটি তালিকা তৈরি করে যারা সম্পূর্ণভাবে অতিমারী পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছেন । খুব স্বাভাবিক ভাবেই ট্রাম্প ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জর বলসোনারওর সাথেই এই তালিকার একদম শুরুতে নাম রয়েছে ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতির ভেকধারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (অনেকে ইনাকে ফ্যাসিস্ট বলেও আলহ্যায়িত করছেন – ইনার কার্যকলাপে জন্য)। সারাদেশে যখন নদীতীরে শয়ে শয়ে মানুষের লাশ ভেসে উঠছে, চিতা জ্বলছে, হন্যে হয়ে মানুষেরা তার প্রিয়জনের জন্য অক্সিজেনের খোঁজ করে চলেছে, কেন্দ্র সরকারের চূড়ান্ত ব্যর্থতার ফলে যখন হাসপাতালগুলির হাতে থাকা কিছু ঘণ্টারও অক্সিজেন ফুরিয়ে যেতে বসেছে তারা তখন বাধ্য হয়ে কোর্টে গেছে । সেই সংকটের মুহূর্তেও ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহেতা হাসপাতাল গুলিকে ভর্ৎসনা করে সরকারের দোষ ঢাকতে চেয়েছেন । তবে এলাহাবাদ হাইকোর্টও সরকারকে জানিয়েছে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু কোন স্বাভাবিক মৃত্যু নয় এ হল গণহত্যা।

করোনা পরিস্থিতিকে সামাল না দিতে পেরে কখনো বিজেপি সরকার উত্তরপ্রদেশে, অক্সিজেন ও ঔষধ চাইলে করোনা রোগীর পরিবার কে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে জেলে ভরার হুমকি ও  আধিকারিকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়েছে । উত্তরপ্রদেশে বিজেপির মধ্যেই বিভিন্ন এমএলএ-রা বেহাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং পার্টির অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা নিয়ে মুখ খুলেছেন। কেউ আবার চুপ করে গেছেন দেশদ্রোহীতার আইনে জেলে যাবার ভয়ে।

উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা জেলার গ্রামে ঘরে ঘরে যখন মৃত্যু তারা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে – যোগীর বিরুদ্ধে । সারা দেশে শুধু মে মাসেই ২৪শে মে পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৮৭,৪১৩ ছাড়িয়েছে অথচ কিছু বিদেশী পত্রিকা সরকার এর ব্যর্থতার সমালোচনা করলে শুধুমাত্র তখনি তাদের টনক নড়ে।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্বজুড়ে ক্রমে বাড়তে থাকলে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন এপিডেমিওলজিস্ট ও ডাক্তাররা জানান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যু হার কমানো এবং এই ভাইরাসের মারন ক্ষমতাকে রোখার জন্য গণ টিকাকরণই হলো একমাত্র উপায়। কিন্তু কেন্দ্রের ‘ফ্যাসিস্ট’ বিজেপি সরকার তাদের সংকীর্ণ ভোটের রাজনীতি, ভারতের যুক্তরাষ্ট্র কাঠামোর বিপরীতে গিয়ে বিভিন্ন রাজ্যগুলিকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র এবং বিজেপি-পুঁজিপতি আঁতাতে থাকা ব্যবসাদারদের আরো লাভের জন্য চৌকিদারি করতে গিয়ে অতিমারীর এই সংকট মুহূর্তেও দেশের নাগরিকদের জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক গুলিকে ক্রমাগত অবহেলা করে চলেছে।  বারংবার প্রশ্ন উঠেছে যেখানে এদেশের অধিকাংশ মানুষই দুবেলা পর্যাপ্ত আহারই পাননা সেখানে কিভাবে একটি স্মার্টফোন জোগাড় করে তার ভ্যাকসিনেশনের জন্য ডেট বুক করবেন। দেশের এক বিরাট অংশের শ্রমজীবী, প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষকে এই টীকাকরণের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত ছাড়া এ আর কি হতে পারে!

লকডাউন এর ফলে কাজ হারানো পরিযায়ী শ্রমিকরা এবং ভিন রাজ্যে থাকা, বিভিন্ন ভাবে স্বাস্থ্যপরিসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া এই মানুষেরা জানেন না কী কী করে, কীভাবে টীকা পাবেন, এবং সরকারের তরফ থেকে এই শ্রেণীর মানুষ কে উদ্দেশ্য করে কোন সচেতনতা মূলক প্রচার এবং এনাদের টীকাকরণের কোন সদিচ্ছা চোখে পড়ে না ।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের অতিমারী সময় অত্যাবশ্যক সামগ্রীর সরবরাহ ও বন্টন সংক্রান্ত, স্বতপ্রণোদিত একটি রিট পিটিশনের উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে রাজ্য সরকার গুলির জন্য বরাদ্দ ৫০% ভ্যাকসিন এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালের জন্য কেবল মাত্র ২৫% ভ্যাকসিনই রাজ্য পাবে এবং বাকি ২৫% বেসরকারি হাসপাতালগুলো ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি থেকে কিনবে। অর্থাৎ বলা যায়, সেন্ট্রাল ড্রাগ ল্যাবরেটরি থেকে যদি টিকার ১০০টি ডোজ বেরোয় তার মধ্যে ২৫টি রাজ্য সরকার কিনতে পারবে এবং বাকি ২৫টি পাবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো।

এর মাঝেই ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতার কারণে দিল্লির কেজরিওয়াল সরকার জানিয়েছে তারা গত ২৩শে মে থেকে ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের টিকাকরণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। দিল্লি সরকার প্রত্যেক মাসে ভ্যাকসিনের ৮০ লাখ ডোজ চাইলেও মে মাসে তারা মাত্র ১৬ লাখ ডোজ পেয়েছে এবং জুনে সেই বরাদ্দ কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ।

মহারাষ্ট্র,কেরালা,তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যই টীকার অপর্যাপ্ত সরবরাহ এর ফলে ১৮- ৪৪ বছর বয়সীদের টীকাকরণ চালাতে পারছে না ।

টীকা প্রস্তুতকারক সংস্থা সিরাম ইনস্টিটিউট ও ভারত বায়োটেক  কেন্দ্রীয় সরকার কে করোনার টিকার দুটি ডোজের প্রতিটি ১৫০ টাকায় দিলেও রাজ্য সরকার গুলিকে প্রত্যেকটি কোভিশিল্ড টিকার ডোজ যথাক্রমে ৩০০ টাকা ও কোভ্যাকসিনের ডোজ ৪০০ টাকায় কিনতে বাধ্য করছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের টিকার ভিন্ন ভিন্ন দামের বিরুদ্ধে অনেকেই সরব হয়েছেন এবং বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে কেন ‘সিঙ্গেল পেয়ার মডেলে’ কেন্দ্র সরকার নিজেই টীকা প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি থেকে সরাসরি টীকা কিনে রাজ্যগুলিকে বন্টন করছে না। প্রশ্ন উঠছে জাতীয় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মধ্যেও কেন টীকার দাম উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে খোলা বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। সিরাম ইনস্টিটিউটের কর্তা আদার পুনাওয়ালা তার “জনকল্যাণমূলক” উদ্দেশ্যে টীকার পুনর্নির্ধারিত দাম ৪০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার আগে CNBC-TV18 চ্যানেলে নির্লজ্জভাবে একটি সাক্ষাৎকারে জানান, সরকাররের থেকে বেশি দামের টীকা বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে বেচে যদি তার বেশিই লাভ হয়, তাহলে তিনি কেন তা করবেন না। এও “উপদেশ” দেন যে,কোন রাজ্যই তো বাধ্য নয় টীকা কিনতে, যদি প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকে তাহলে তারা কিনবে না, প্রত্যেকটি রাজ্যে যথেষ্ট বেসরকারি হাসপাতাল আছে যেখান থেকে মানুষ টীকাকরণ করিয়ে নেবেন, এক্ষেত্রে কোন রাজ্যরই কোন টাকা খরচ করার দরকার নেই!

তার এই কথা থেকে স্পষ্ট একচেটিয়াভাবে বাজার দখল করতে চাওয়া এই টীকা প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো দেশের এত বড় জনসংখ্যা কে লক্ষ্য করে টীকা বিক্রি করে সর্বোচ্চ লাভের অংক তোলা। তাই তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বেসরকারি সংস্থা গুলির ক্রমশ পদলেহন করতে করতে, কেন্দ্রীয় সরকারও সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে আরও দ্রুত

টীকা প্রস্তুত করার জন্য ও অন্যান্য টীকা প্রস্তুতকারক সংস্থাকেও উৎসাহ দেওয়ার জন্যই সরকার টীকার দাম কে বেঁধে দেয়নি। সরকারের আরো যুক্তি যে কেন্দ্র-রাজ্য ও বেসরকারি ক্ষেত্রে টীকার ভিন্ন ভিন্ন দাম বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা গুলির টীকা উৎপাদন বাড়াবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতা থাকলে ন্যায্য দামে টীকাও পাওয়া যাবে ।

কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রের  এধরনের অবিবেচক সিদ্ধান্তের ফলেই রাজ্য সরকারগুলি বাজারে আলাদা আলাদা করে টেন্ডার ডেকে ভ্যাকসিন কিনতে গেলে, এই সুযোগে ভ্যাকসিনের দাম বাড়বে বৈ কমবে না। স্বাস্থ্যকর্মীরা ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কর্মীরা জানিয়েছেন কখনোই যার সামর্থ্য আছে সে করোনা প্রতিষেধক টীকা নিলেই করোনা নির্মূল হবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরে ও দারিদ্র্যসীমার নীচে থাকা মানুষজনের জন্য পোলিও রোগের বিরুদ্ধে টীকাকরণের মতই ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায়  সর্বজনীন এবং বিনামূল্যে দ্রুত টীকাকরণই একমাত্র উপায়। সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন আইনজীবীরা কেন্দ্রীয় সরকারকে পেটেন্ট অ্যাক্ট র ৯২ ধারাকে কাজে লাগাবার পরামর্শ দিয়েছে, যার ফলে যেকোনো ওষুধ ও টীকা প্রস্তুতকারক সংস্থাকে সরকার টীকার পেটেন্ট হোল্ডারের অনুমতি ছাড়াই  কম্পালসারি লাইসেন্সিং প্রদানের মাধ্যমে টীকা তৈরি করার অনুমতি দিতে পারে। কিন্তু আরো জটিলতা বাড়িয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যখন জানতে চাওয়া হয় ভারত বায়োটেক এর কোভ্যাকসিন যখন যৌথভাবে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল  অফ মেডিক্যাল রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজির সহায়তায় গবেষণার মাধ্যমে ও সরকারি অনুদান এর ফলে প্রস্তুত করা হয়েছে, তখন সেই টীকার ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস কেন একটি ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থা পাবে, স্বাভাবিকভাবেই সেই টিকার ওপর প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার থাকার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে তারা কোন ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থাকেই কোনরকম সাহায্য বা অনুদান বাবদ কোন টাকাই দেয়নি। শুধুমাত্র টীকা কেনার অগ্রিম মূল্য হিসেবে সিরাম ইনস্টিটিউটকে ১৭৩২.৫০ কোটি টাকা ও ভারত বায়োটেককে ৭৮৭.৫০ কোটি টাকা দিয়েছে ।

তবে শুধু দেশীয় ভ্যাকসিন “মাফিয়ারা” নয়, এস্ট্রাজেনেকার সাথে সীরাম ইনস্টিটিউটের লাইসেন্স চুক্তির অস্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক উদ্যোগগুলিতে জনসেবার টোপ দেখিয়ে ব্যক্তি পুঁজির প্রবেশ বিল গেট্‌স ফাউন্ডেশন (Gates Foundation ) ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইম্যুনাইজেশন (GAVI) র মতো বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট সমন্বয় গুলির  প্রাধান্য এবং উন্নত দেশগুলি প্রয়োজনের থেকেও অনেক বেশি পরিমাণ টীকার ডোজ মজুত করে রাখার ফলে, উন্নয়নশীল দেশ গুলিতে সর্বোচ্চ জনসংখ্যাকে টীকাকরণ করা যথেষ্ট বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

নিজের সন্তানদের জন্য টিকার দাবি করে রাস্তায় পোস্টার মারলে যতই পুলিশ নাগরিকদের গ্রেপ্তার করুক – সত্যিটাকে আড়াল করা সম্ভব নয়। করোনা সংক্রমনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগে সিরাম ইনস্টিটিউট এস্ট্রাজেনেকা ও GAVI র সাথে ব্যাবসায়িক চুক্তির ভিত্তিতে ৮৪ শতাংশ ভ্যাকসিন বিদেশি পাঠায়।

টীকার মূল্যের প্রসঙ্গ উঠলেই সিরাম ইনস্টিটিউটর সিইও আদার পুনাওয়ালা জানিয়েছেন তাদেরকে নাকি এস্ট্রাজেনেকা কে ৫০% রয়্যালটি প্রাইস দিতে হচ্ছে। ইমিউনলোজিস্ট, কেভি বালাসুব্রামানিয়াম জানিয়েছেন এত উচ্চহারের রয়্যালটি প্রাইস কি করে হয় তাঁর বোধগম্যের বাইরে, তাঁর মতে সাধারণত রয়্যালটি প্রাইস নির্ধারিত হয় ৫%-১০% এর মধ্যেই । ফাইজার, এস্ট্রাজেনেকা, মডরনার মতো ভ্যাকসিন গুলি যথাক্রমে ব্রিটেন ও আমেরিকার সরকার এর বিভিন্ন পাবলিক ফান্ড থেকে অনুদান পেলেও সরকারকে অনেক ক্ষেত্র পেটেন্ট বা লাইসেন্সর টাকা দেয়নি এবং বিরাট একটা লাভের অংক পকেটে পুরেছে ।

শুধু টীকাই নয়, কোভিড-১৯ সামগ্রিকভাবে সারাদেশের জনস্বাস্থ্যের বেহাল দশাকে সামনে এনেছে । হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের  হাসপাতালগুলোতে প্রত্যেক দশ হাজার মানুষের জন্য মাত্র পাঁচটি শয্যা বরাদ্দ রয়েছে এবং ৮.৬ জন ডাক্তার রয়েছেন প্রত্যেক 10,000 মানুষের জন্য । কোভিড-১৯ এর সংক্রমনে আক্রান্ত হয়েই নয় বরং সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে এই বছরের এপ্রিল মাস থেকে অনেক রোগী মারা গেছেন পর্যাপ্ত আইসিইউ বেডের অভাব, ভেন্টিলেটরের ও অক্সিজেনের অভাবে। বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের সতর্কতা থাকলেও সংক্রমণের প্রথম ঢেউ নিম্ন মুখী হওয়ার সাথে সাথেই সরকার সমস্ত বিধি-নিষেধকে অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন রাজ্যের ভোটের জন্য বড় বড় রাজনৈতিক জমায়েত ও কুম্ভ মেলার মত বড় ধার্মিক অনুষ্ঠানে জমায়েত হওয়া ও একসাথে স্নান এর মত ঘটনাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। উত্তরপ্রদেশে পঞ্চায়েত ভোটের ডিউটিতে যাওয়া প্রায় ৭০০জন শিক্ষক মারা গেছেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। কুম্ভমেলাকে এ বছরে আটকাবার জন্য বিজেপি থেকে অপসারিত হতে হয়েছে উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ত্রিবেন্দ্র সিং রাওয়াতকে এবং শুনতে অবাক লাগলেও, এক বিজেপি নেতা, এই সংকটের মুহূর্তেও মানুষ ধর্মকেই আগে বেছে নেবে মনে করে, এই বছর এত বড় অনুষ্ঠান করার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের আগামী বিধানসভা ভোটকে।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে বারংবার এসে বিরাট জনসভা করে গেছেন, দেশের মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনের বড় বড় মাথারাও ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতা এবং সংক্রমনের আরেকটি ঢেউ আসলে তার জন্য হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা এসবই কেউই মাথা ঘামানোর সময় বোধহয় পাননি । করোনার এই সংকটের মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশ সহ বিভিন্ন গ্রামে ধরা পড়েছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুলির বেহাল ও ভগ্নপ্রায় দশা। উত্তরপ্রদেশের অধিকাংশ গ্রামেই তাই নেই করোনা টেস্টের ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও। বারানসির একটি গ্রামের প্রধান সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন যেখানে তার গ্রামে পঞ্চাশের বেশি লোক মারা গেছে কিন্তু সরকারিভাবে গণনায় ধরা হয়েছে শুধুমাত্র ৮ থেকে ১০ জনকেই ।

নিঃসন্দেহে বলা যায় নব্বইয়ের দশকের পর থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা যে প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার এ প্রসঙ্গকে অবহেলা করে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে বেসরকারি উদ্যোগপতিদের হাতে তাদের মুনাফার জন্য ছেড়ে দেওয়া, ধুঁকতে থাকা সরকারি স্বাস্থ্যখাতে প্রত্যেকটি অর্থবর্ষে  প্রয়োজনীয় টাকা বরাদ্দের অভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকার কারণই করোনা কালের সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। গত বছর মে মাসে কেন্দ্র ২০ লক্ষ কোটি টাকা আর্থিক “স্টিমুলাস প্যাকেজ” ঘোষণা করলেও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা জানিয়েছেন তার মধ্যে স্বাস্থ্যের জন্য  বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত অপর্যাপ্ত এবং জিডিপি-র মাত্র ০.০০৮%। জনস্বাস্থ্যে অর্থ বরাদ্দ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জিডিপির ১ শতাংশই থেকে গেছে এবং ২০০৪ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ২ থেকে ৩% করবে জানালেও তা এখনো হয়ে ওঠেনি।

১৯৯০ সালের পর ভারত সরকার এর “নিউ ইকোনমিক পলিসি” র মাধ্যমে  নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির খোলা

বাজার এর নিয়ম দেশের সর্ব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে থাকে। রাষ্ট্র ক্রমশ সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে তার নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব এবং জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলি থেকে পিছু হটতে থাকে, চলতে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বৃহৎ পুঁজির দ্বারা মানুষের শ্রম শোষণ ও পরিবেশ শোষণ। ১৯৯১ সালে WTO ও IMF র হাত ধরে স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম বা SAP-এর মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে বেসরকারিকরণ শুরু হয়, এবং সরকারি বরাদ্দের অভাবের ফলে ধুঁকতে থাকা জনস্বাস্থ্য বাজার অর্থনীতির লাভ-লোকসানের খেলায় আরো অবহেলিত হতে থাকে ।

এছাড়া পরবর্তীকালে বিভিন্ন ‘পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা’ গুলিতে যেমন, দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১২) দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলিকে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে পরিষেবা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় তার সাথে দেওয়া হয় তাদের নিজেদের মতো শর্ত ও বিধান আরোপ করার ক্ষমতাও। ২০১৭ সালে ন্যাশনাল হেলথ পলিসি বিল আনা হলে, বিলের খসড়ায় থাকলেও, আসল বিলটি থেকে বাদ পড়ে ন্যাশনাল হেলথ রাইটস অ্যাক্ট-এর মতো প্রয়োজনীয় বিধান, যা অনুযায়ী স্বাস্থ্যের অধিকার নাগরিকদের  মৌলিক অধিকার এবং প্রত্যেকের অধিকার আছে সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যপরিসেবা পাওয়া । ‘দ্য ইকোনমিক সার্ভে’ জানিয়েছে ভারতে নাগরিকদের বিশেষত বিভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠী থেকে আসা মানুষদের ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য খাতে আউট- অফ -পকেট এক্সপেন্ডিচার(OOPE) সবথেকে বেশি। যা তাদেরকে বিভিন্ন সময় আর্থিক অনটন ও দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেয়। এই সমস্যার সমাধান যতদিন না স্বাস্থ্যখাতে সরকার ব্যয় বরাদ্দ করছে ততদিন সম্ভব নয় ।

‘ইন্ডিয়াস্পেন্ড’ নামক অনলাইন পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী যেখানে দেশের মোট হাসপাতালের দুই-তৃতীয়াংশ শয্যাই এবং দেশের ৮০% ভেন্টিলেটর বেসরকারি হাসপাতালের, তাও সেখানে এই সংকটের মুহূর্তে দেশের মাত্র ১০% করোনা রুগীর চিকিৎসা চলছে । এইসব বেসরকারি ক্ষেত্রে অনেক রাজ্যেই করোনা টেস্টের খরচা ৪ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে।

বিভিন্ন দলাদলির রাজনীতির মাঝে, এ সরকারের বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশের মানুষের জন্ম নেওয়া ক্ষোভ যদি জনস্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকার গুলির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠতে না পারে এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্র যে মুনাফা লোটার জায়গা নয় এবং সার্বিকভাবে পুঁজিবাদী ও নির্দিষ্ট কিছু মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনের দ্বারা সারা পৃথিবীর মানুষের শোষণ ও সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা না করা যেতে পারে তাহলে এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় খুব একটা বেশি দেখা যায় না।

  • সূত্র : The Scroll, The Hindu, Indiaspend, Quartz ও অন্যান্য
  • মতামত লেখকের নিজস্ব
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on কেন্দ্রের ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের ‘চৌকিদারিতে’ চুরি গেল দেশের মানুষের ভ্যাকসিনও

Leave A Comment