মোদী জামানায় পেট্রো পণ্যের দাম কেন লাগামছাড়া?

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 7 months by admin

 

বেশ কয়েকদিন ধরে পেট্রল ডিজেলের দাম বেড়ে চলেছে। রান্নার গ্যাসের দামও আবার বেড়ে গেল। দেড় মাসের মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়লো দেড় শ’ টাকা। পেট্রল – ডিজেলের দাম বাড়ায় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিও ঘটেই চলেছে। কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো আন্দোলন নেই। খবর শুধু দল বদল নিয়ে। লাগামছাড়া পেট্রো-পণ্যের দাম নিয়ে কোনো আলোচনা প্রায় নেই। সেই পেট্রল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায়  সঞ্জয় পাঠক।

 

পেট্রল ডিজেলের দাম হু হু করে বাড়ছে বললেও কম বলা হবে। বিশেষত মোদী জামানায় তেলের  দাম দৈনন্দিন রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড তৈরী করছে। কয়েকদিন আগে টানা ২২ দিন দাম বাড়ার  রেকর্ডও আমরা দেখেছি। নতুন করে আবার টানা আটদিন ধরে দাম বাড়লো। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার সাথে দেশে তেলের দাম বাড়তে দেখা গেছে। পাশাপাশি ক্রুড অয়েলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট কমলেও দেশে তার দামের উর্ধমুখিনতা যেন এক স্বাভাবিক ছবি! এর মূল কৃতিত্ব দাবী করতে পারে মোদী সরকার।

ভারত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল আমদানি করে প্রয়োজনের ৮৩ শতাংশ। ২০১৮ সালে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ৭০ ডলার। এক ব্যারেল তেল প্রায় ১৫৯ লিটারের সমান। ২০২০ সালের প্রথম দিকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৪৯ ডলার। তাহলে দেশে পেট্রোল ডিজেলের দাম কেন সব সময় উর্দ্ধমুখী যখন ক্রুড অয়েলের দাম অনেকটাই পড়ে যায়?

 

পৃথিবী জুড়ে ২০০-র বেশী পেট্রোলিয়াম কোম্পানি আছে। সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯২৪ লাখ ব্যারেল ক্রুড অয়েল ব্যবহৃত হয়। ভারতে প্রতিদিন ব্যবহৃত হয় ৩৫ লাখ ব্যারেল। পিএসইউ, প্রাইভেট ও জয়েন্ট ভেঞ্চার মিলিয়ে ২৩টি রিফাইনারি এদেশে আছে। পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের মধ্যে পড়ে পেট্রল, ডিজেল, এলপিজি ও কেরোসিন। দেশে ২০১৯ সালে রিফাইন্ড পেট্রোলিয়াম উৎপন্ন হয়েছে ২৪৯.৩৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বিক্রি হয়েছে ২১৩.২২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাকিটা রপ্তানি হয়েছে। কিছু ক্রুড অয়েল উৎপন্ন করে ওএনজিসি ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। ২০১৩ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ভারত সরকারের রেকর্ড বলছে, ক্রুড অয়েল ও ন্যাচারাল গ্যাস দেশে উৎপাদন ক্রমাগত কমেছে। ওদিকে ক্রুড অয়েল রিফাইনিং বেড়েছে বহুগুণ। ৮০ শতাংশ আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে বর্তমানে। প্রশ্ন উঠেছে, এটা কী স্বাভাবিক না কী অন্য কোন মহলের মদত আছে? কেন দেশের একমাত্র ঋণ মুক্ত ও সবচেয়ে লাভজনক সংস্থা ওএনজিসিকে শুকিয়ে ফেলা হল?

২০১৮ সালে ‘কমট্রোলার এন্ড অডিট জেনারেল’ বলেছিল, গুজরাট স্টেট পেট্রলিয়াম কর্পোরেশন (জিএসপিসি) ২০ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির সাথে যুক্ত আছে। অভিযোগ উঠেছিল, ২০০২ সালে তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে। মোদীজী বলেছিলেন, কৃষ্ণা গোদাবরী বেসিনে ২০ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট তেল ও গ্যাস আছে। দাবী করেছিলেন, ভারতে যত গ্যাস উৎপন্ন হয় তার  থেকেও বেশী উৎপাদন হবে। ২০১৬তেও জিএসপিসিতে কোন উৎপাদন শুরুই হল না। ২০১৫ মার্চ পর্যন্ত ১৫টি ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা লোন তুলে নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ২০১৭  সালে ওএনজিসিকে চাপে ফেলে ৮০০০ কোটি টাকা দিয়ে জিএসপিসিকে কেনানো হল। ২০১৮ সালে হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ৫১১১ ইকুইটি মোদী সরকারের ফিস্কাল ডেফিসিট মেটাতে জোর করে ওএনজিসিকে দিয়ে অধিগ্রহণ করান হয়েছে। মার্কেট রেট থেকে ১৪ শতাংশ বেশী দিয়ে মানে ৩৬,৯১৫ কোটি টাকায় কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে, ওএনজিসি ৩৫,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হয়। ঋণ শোধ করতে ওএনজিসি শেয়ার বিক্রি করার উদ্যোগ নেয়। এক কথায়, ওএনজিসিকে পরিকল্পিত ভাবে ছিবড়ে করে দিয়ে প্রাইভেট কোম্পানির রমরমা বাড়িয়েছে মোদী সরকার।

 

ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই এদেশে কি করছে? এফডিআই ভারতে সব ধরণের এক্সপোর্ট তদারকিতে এক নম্বর মাতব্বর। ‘ইন্সটিটিউট ফর স্টাডিস ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট’-এর অধ্যাপক কে এস চালাপাতি রাও-এর বক্তব্য হল, ‘ভারতে এমন কোন মেকানিসম নেই যেখান থেকে জানা যাবে এফডিআই ঠিক কী করছে’? এক কথায় ভারতীয় অর্থনীতিকে নির্ভরশীল রেখে লুঠের রাস্তা জিইয়ে রেখেছে এফডিআই।

 

এদেশে ২৩টি রিফাইনারি আছে যার মধ্যে ৩টি প্রাইভেট ও ২টি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি। এর ৯০ শতাংশ ব্যবসা করে করে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ও রিলায়েন্স। এরা প্রসেসিং, রিফানিং ও বিক্রি করে। আগে রিফাইন করার পর কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের দাম নির্ধারণ করত। মোদী জামানায় সরকারী নিয়ন্ত্রণ উঠে গিয়ে চলে এসেছে অয়েল মার্কেটিং কোম্পানিগুলির হাতে।

দেশের মানুষকে ঠকাবার আরও একটি কৌশলী দিক এরা নির্ধারণ করেছে মোদী জামানায়। ১ লিটার ক্রুড তেল থেকে কার্যত এক লিটারের বেশি মূল্যের পেট্রোল/ডিজেল এবং উপজাত দ্রব্যাদি পাওয়া যায় যা ১.১৫ লিটার পেট্রোলের সমান দাম। দ্বিতীয়তঃ পরিবেশে দূষণ কমানোর জন্য ২০১৭ থেকে তেল শোধনাগার কোম্পানিগুলি পেট্রোলে ১০% ইথানল মেশায় যা বাজারে ৪৩.৭৫টাকা/লিটার পাওয়া যায়। ৪৩.৭৫ টাকা মূল্যের ইথানল কিন্তু ৮৬.১৫ টাকা মূল্যের পেট্রোলের দামেই বিক্রি করা হয়। ফলে অয়েল মার্কেটিংকোম্পানিগুলি অতিরিক্ত মুনাফা করছে।

 

২০১৪-র মোদী জামানা থেকে লাগাতার পেট্রলের দাম বৃদ্ধি ইতিপূর্বে কখনো ঘটেনি। প্রতিদিন তৈরী করেছে নয়া নয়া রেকর্ড। বিশ্ব ইতিহাসে এর কোন তুলনা মিলবে না। আগেই বলেছি, দাম নিয়ন্ত্রনের যতটুকু সরকারী ভূমিকা ছিল তা বরবাদ হয়েছে মোদী জামানায়। একই সাথে বাড়ানো হয়েছে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স।

 

যখন বিজেপি ক্ষমতায় এল মে ২০১৪তে, এক্সাইস ডিউটি পেট্রলে ছিল লিটারে ৯.২০ টাকা ও ডিজেলে ৩.৪৬ টাকা। গত ৬  বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালে সেটা দাঁড়িয়েছে পেট্রলে লিটারে ২৩.৭৮ টাকা ও ডিজেলে ২৮.৩৭ টাকা। ডিজেলের ক্ষেত্র এক্সাইস ডিউটি বেড়েছে ৮২০ শতাংশ, পেট্রলে বেড়েছে ২৫৮ শতাংশ।  কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টে যত ট্যাক্স তোলে তার ৮৫-৯০ শতাংশ হল এক্সাইস রেভেনিউ। ২০১৪-১৫ সালে রেভেনিউ ছিল ১৭২০ বিলিয়ন টাকা, ২০১৯-২০ সালে ৯৪ শতাংশ বেড়ে হল ৩৩৪৩ বিলিয়ন টাকা। ওদিকে রাজ্য সকারগুলি ভ্যাট বাড়িয়েছে ৩৭ শতাংশ। গত বছর সরকার বলেছে, ট্যাক্স আরও বাড়বে। ২০১৪তে পেট্রলে ট্যাক্স ছিল ৩১ শতাংশ, ডিজেলে ছিল ১৯ শতাংশ। ২০২০তে পেট্রলে বেড়ে হয়েছে ৬৯ শতাংশ, ডিজেলে হয়েছে ৫৮ শতাংশ।

ভারত পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট এক্সপোর্টও করে এই খবরটি প্রকাশ্যে আসে ২০১৮ সালে আরটিআই-এর মাধ্যমে। খবরটি ছিল, ভারত ১৫টি দেশে রিফাইন্ড পেট্রল ৩৪ টাকা প্রতি লিটার দরে রপ্তানী করে। ডিজেল রপ্তানী করে ২৯টি দেশে ৩৭ টাকা প্রতি লিটার দরে। আরটিআই-এর উত্তর দিয়েছে ম্যাংগালোর রিফাইনারি পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড। যখন তেলের দাম আকাশ ছোঁয়া তখন কেন তা এক্সপোর্ট করা হবে, এসব বেয়াড়া প্রশ্ন না তোলাই ভাল।

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on মোদী জামানায় পেট্রো পণ্যের দাম কেন লাগামছাড়া?

Leave A Comment