যা কিছু গোপনে বলতে চাই না

মতামত রাজনীতি

Last Updated on 8 months by admin

সিদ্ধার্থ বসু

 

নো ভোট টু বিজেপি–স্লোগানের আড়ালে আসলে বেলাজ তৃণমূল তোষণ চলছে–এইরকম মত বেশ কিছু পক্ষের। যে তৃণমূল কিনা ফাসিস্ত বিজেপিরই আরেক সমকক্ষ অনাসৃষ্টি। আবার, নির্বাচনী লড়াই ফ্যাসিবাদকে রোখে না, কাজেই ভোট দেওয়া না দেওয়া নিয়ে জোটবদ্ধ হওয়া ভিত্তিহীন–এমন অভিযোগও উঠছে। এমতাবস্থায় পারস্পরিক বোঝাপড়াগুলোকে সাধারণ বোধবুদ্ধির বিচারে একবার ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যাক।

 

১. বলতে চাওয়া হচ্ছে যে সিপিএমের ভোটাররা সব সিপিএমকেই ভোট দিন। বোঝাই যাচ্ছে যে এক্ষেত্রে একটা আগাম অবধারণ হল গত লোকসভায় বিপুল সংখ্যক সিপিএম সমর্থক(জানি না হয়তো সদস্যেরাও) বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। তার কারণ হিসেবে তাঁদের মধ্যে কী আদর্শ ও পরিকল্পনা কাজ করেছিল তা এখন মোটামুটি স্পষ্ট। এই বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি আমরা আর চাই না। কারণ বলা বাহুল্য। এতে করে বিজেপির ভোট কমবে।

২. অবধারিত পরবর্তী তর্ক হল, এই ভোট প্রত্যাবর্তনে সিপিএম কি জিতবে? সম্ভাব্য এবং প্রায় নিশ্চিত উত্তর হল ‘না’। এই বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্টের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা সেক্ষেত্রেও প্রায় থাকবে না বললেই চলে। সুতরাং, সিপিএম বিজেপির ভোট কাটলে তৃণমূলের জেতার সুযোগ বাড়বে। এবং যেহেতু তৃণমূলও ‘ফ্যাসিস্ত’, কাজেই ১ নং প্রস্তাবনায় কোনো শুভ ফল নেই।

৩. এখানে বলার যে তৃণমূল সম্পর্কে অজস্র অভিযোগ আছে। আমাদেরও, আরো অন্যান্য পক্ষের মতোই। কাজেই সে অর্থে তাদের জয়যুক্ত করতে বলায় সমস্যা হয়, বলতে পারি না, বলছিও না। কিন্তু অভিযোগ কি আমাদের সিপিএমের বিরুদ্ধেও নেই? কিম্বা কংগ্রেসের বিপক্ষে? সিপিএম নিজেরাও কি কংগ্রেসের অনাচার বা স্বৈরাচার বিষয়ে খুব ইতিবাচক ধ্যানধারণা নিয়ে চলে? তবে আজ কেন এই হাত-ধরাধরি? বোঝাপড়া? জোট? বিজেপিকে ভোটে হারানোর জন্যই তো? অতএব আরো কে কে কতখানি অশুভ সে খতিয়ান এখন মুলতুবি না রেখে পথ নেই। মনে মনে গেঁথে নিন আমরাই সবচেয়ে ভালো, অন্য সবাই মন্দ। কিন্তু এ বিধানসভা ভোটে সে মনোবৃত্তির প্রতিফলন ঘটালে চলবে না। কারণ একটাই, বিজেপির হার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. এর গায়েগায়েই উঠে আসবে ‘ফ্যাসিবাদকে ভোটযুদ্ধে হারিয়ে ফল নেই’ প্রতর্ক। আমরা একমত। ফ্যাসিবাদের পরাজয় নির্বাচনী লড়াই দিয়ে স্থিরীকৃত হয় না। ময়দানের লড়াই চাই। রাস্তার লড়াই। কিন্তু তা বলে নির্বাচনে ফ্যাসিস্তরা জিতে আসুক–এমন নেতিবাচক নৈরাশ্যের দিকে যাই কী করে? বিজেপিকে ভোটে হারালেই ফ্যাসিবাদ মুছে যাবে না, সত্য। কিন্তু তাকে ভোটে জিততে দিলে কিছু বাড়তি সুবিধা আছে কি?

৫. পুনরাবৃত্তি হলেও বলতে হয় যে বিজেপি একা ফাসিস্ত নয়, অতএব তৃণমূলের বিরোধ করা হচ্ছে না কেন–এই পর্যালোচনাও উঠে আসছে। আমরা বলি, একশোবার। তৃণমূলের অপশাসনে আমরা ব্যতিব্যস্ত, সন্দেহ কি? কিন্তু ফ্যাসিবাদ যে তার বাইরেও গর্জমান। কংগ্রেস ফাসিস্ত নয়? সিপিএমের মধ্যেও কি স্থানে স্থানে ফুটে বেরোয়নি ফ্যাসিবাদী প্রবণতার ঝোঁক? কিন্তু এসব এখন তোলা থাক। ওই যে বললাম, ধরে নিন আমরাই(যে যে দলের সদস্য বা সমর্থক) সবচাইতে সেরা, অন্যেরা সক্কলেই স্বল্পাধিক মন্দ। কিন্তু আজকের লড়াইতে আমরা শুধুমাত্র বিজেপির ফ্যাসিজমকেই নিশানা করব, কারণ সেই বিপদটাই সক্কলের চেয়ে বড় হয়ে, নিকট হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের সামনে। এবং এ লড়াই সত্যিই শুধু ভোটের লড়াই নয়। মাঠে রাস্তায় প্রতিটি লড়াকু মানুষ আমাদের নিজেদের লোক। কিন্তু আপাতত ভোটের লড়াইটাকেও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যাওয়া সম্ভব নয়। এমনকি উচিতও নয়।

৬. সবশেষে কথা উঠতে পারে যে সব পক্ষের কথা বললেও তথাকথিত তৃতীয় ধারার শক্তিগুলোর কথা কিছুই বল্লাম না কেন। উত্তর আগেই দিয়েছি ওপরে। আমরা ধরে নিচ্ছি(এই শক্তিগুলো, যদি অবশ্য তাদেরও কোনো সমন্বিত রূপ থেকে থাকে) আমরাই সেরা, অপাপবিদ্ধ, অন্য সক্কলে ভুল এবং অশুভ। কিন্তু সেই ধরে নেওয়াটা মনের গহীনে তলিয়েই থাক আপাতত। এবারের ভোট বিজেপি ও অবিজেপি–এই মেরুকরণ অনিবার্য করে তুলেছে। দেখা যাক এই লড়াইটাতে সবাই মিলে বিজেপিকে হারিয়ে দিতে পারি কিনা।

৭. অতএব, উপসংহারে বলি, সিপিএমের ভোটাররা তাদেরই ভোট দিন, তৃণমূলের ভোটাররাও তৃণমূলকে। তৃতীয় শক্তির প্রার্থী যেসব জায়গায় থাকবে, সমর্থকেরা নিঃসংশয়ে তাঁদের অনুকূলে ভোট দেবেন। শুধু বিজেপিকে একটিও ভোট নয়।

 

[মতামত লেখকের নিজস্ব]

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on যা কিছু গোপনে বলতে চাই না

Leave A Comment