কেন ‘নো ভোট টু বিজেপি’

মতামত

Last Updated on 7 months by admin

শতাব্দী দাশ

 

ডলোরাস ইবারুরির ‘নো পাসারন’ কোনো নেতিবাচক ঘোষণা নয়। ‘নো NRC-NPR-CAA’ কোনো নেতিবাচক প্রচার নয়। বাক্যে না-বাচক শব্দ থাকলে বাক্যটি না-বাচক হয় মাত্র। বক্তব্যটি নেতিবাচক নাও হতে পারে। অথবা তা নেতিবাচক কিনা, তা নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর।

ঠিক সেই কারণেই ‘নো ভোট টু বিজেপি’-ও কোনো ‘নেতিবাচক প্রচার’ নয়। না থেকে হ্যাঁ তে যাওয়ার পথটি যে সুদীর্ঘ, তা বামপন্থীদের অজানা হওয়ার কথা নয়। নেতির নেতি নিয়ে মার্ক্সের দীর্ঘ আলোচনা ছিল। এক্সটেনশন, এক্সপ্লোরেশন, নেগেশান অফ নেগেশন, কোয়ান্টিটির থেকে কোয়ালিটির দিকে যাত্রা-এসব দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের অংশ।

‘নো-ভোট-টু-বিজেপি’ কি ‘ভোটের স্লোগান’? তাহলে আমরা কি ভোটের প্রচারে নেতিবাচক দেওয়াল লিখন লিখব?

ফ্যাসিবাদকে শুধুমাত্র ভোটের মাধ্যমে পরাস্ত করা যায়, তা আমরা বিশ্বাস করি না। এই আন্দোলন ভোটের পরেও চলবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রচার বামপন্থীদের প্রাথমিক দায়িত্ব। তাই ভোট প্রভাবিত করা আমাদের ‘একমাত্র’ লক্ষ্য নয়। ‘শুধু’ নির্বাচনী রাজনীতিতে আটকা পড়ে যেতে আমরা চাই না, কারণ রাষ্ট্র ও পুঁজির জোট সংসদীয় গণতন্ত্রের  প্রকল্পকে যে কোনো মুহূর্তে বিপর্যস্ত করতে পারে। তার ফলেই ফ্যাসিবাদের বিপদ ঘনিয়ে আসে। ফ্যাসিবাদ একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিপদ। তাকে ‘শুধু’ ভোট দিয়ে পরাস্ত করা যায় না।

কিন্তু এটাও সত্যি যে ভোটে বিজেপি জিতলে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় সঙ্ঘ আসবে, পুলিশ-প্রশাসনের মাথায় বসবে আরএসএস। তার ফল কী হয়, তার নমুনা উত্তরপ্রদেশে আমরা দেখছি। পশ্চিমবঙ্গ ইউপি, আসাম, ত্রিপুরা সঙ্গে তুলনীয় হোক, তা আমরা চাই না। তাই আসন্ন নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টাও আমাদের করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে।  বিজেপির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া মানে কিন্তু স্রেফ ‘ক্ষমতা পরিবর্তন’ নয়, বরং আগামী এক বা কয়েক দশকের জন্য ফ্যাসিবাদকে বরণ করা। ফ্যাসিবাদী শক্তি গণতান্ত্রিক ভোট পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করেছে, এমন নজির ইতিহাসে বহু আছে। তাই ভোটে বিজেপিকে আটকে দিতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়।

***

বিজেপি কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা পার্টি নয়। সঙ্ঘ পরিবারের উত্থানের ইতিহাস দীর্ঘ। পশ্চিমবঙ্গের কথাও যদি বলা হয়, তবে সত্তরের দশকেও এখানে ছিল তাদের কার্যকলাপ।  নব্বই-এর দশকেও এখানে সরস্বতী বিদ্যামন্দির স্থাপিত হয়েছে। এই দীর্ঘ অধ্যাবসায়ের ফসল তারা এখন ঘরে তুলছে। তাই ‘তৃণমূলই বিজেপিকে এনেছে’ বড্ড বেশি সরলীকরণ বা তৃণমূলের মতো লুম্পেন পার্টির ক্ষমতাকে বড় অতিকৃত করা।

কেন বিজেপিকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলছি, তাও বিশ্লেষণ করি( যদিও তা বামপন্থীদের বিশ্লেষণ করে বোঝাতে হবে, এমনটা ভাবা যায়নি)। ১৯৩০-এর দশকে ফ্যাসিবাদের জন্ম প্রথমে ইতালিতে, পরে জার্মানিতে। তা ছিল  গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের “বাড়াবাড়ির” বিরুদ্ধে হিংস্র প্রতিক্রিয়া। মুসোলিনি ও হিটলার দাবি করেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি-জার্মানির পরাজয়ের জন্য এগুলিই নাকি দায়ী। তাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁরা জনগণের জীবনের সব দিকের ওপর চরম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। মানে ফ্যাসিবাদের উত্থানই হয়েছিল গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্য রুখতে।

অবশ্য সমাজবাদও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্য ও গণতন্ত্রের কথা বলে না। তাহলে দুয়ে বিরোধ কেন? সমাজতন্ত্র যদি হয় সাম্যবাদী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী, ফ্যাসিবাদ তবে উগ্র জাতীয়তাবাদী। ‘ফ্যাসিও’ শব্দের মানেই নাকি অনেকগুলি লগি বা লাঠির গোছা। লাঠি একদিকে কর্তৃত্বের প্রতীক। গোছা আবার একত্বের প্রতীক। অথচ  একটি সমাজে মানুষ নানা ধর্মে, শ্রেণীতে, লিঙ্গে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ভূগোলে বা ইতিহাসে বেড়ে ওঠে। বৈচিত্র্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফ্যাসিস্টরা পার্থক্য ও বিভিন্নতা অস্বীকার করে সবাইকে একটিমাত্র পরিচয়ে বাঁধতে চায়। মানুষের অন্য সব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক মূল অস্বীকার করে নিজেদের একটি ‘হিন্দুজাতি’ হিসেবে কল্পনা করার কথা কিন্তু বিজেপিও বলে। ফ্যাসিবাদের নীতি মেনে বিজেপি তৈরি করেছে

  1. নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মিথ
  2. হিন্দুজাতির পুনর্জাগরণের প্রবাদ
  3. জনপ্রিয় উগ্র-জাতীয়তাবাদ।

এসবই ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।

লুনা রুশদি ফ্যাসিবাদের চোদ্দটি লক্ষণ শনাক্ত করেছিলেন। ২০০৩ সালে ‘ফ্রি এনকোয়ারি’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তাঁর লেখা।

১. পরাক্রমী  জাতীয়তাবাদ – ফ্যাসিবাদী শাসনকালে দেশভক্তিমূলক আদর্শ, শ্লোগান, গান, প্রতীক এবং অন্যান্য সাজসজ্জা ইত্যাদি ব্যবহার বেড়ে যায়। মিল পাচ্ছেন ভারতের সঙ্গে?
২. মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা বা ঘৃণার প্রকাশ – ফ্যাসিবাদী সমাজব্যবস্থায় জনসাধারণকে বিশ্বাস করানো হয় যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজনের’ খাতিরে মানবাধিকার উপেক্ষা করা যায়। মিল পাচ্ছেন?
৩. শত্রু/বলির পাঁঠা শনাক্ত করা –  ফ্যাসিবাদ এক বলির পাঁঠা বা ছায়াশত্রু খুঁজে নেয়। এক্ষেত্রে ভারতের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বলির পাঁঠা মুসলিম-দলিত-আদিবাসী। এছাড়া কমিউনিস্ট ও উদারমনস্করা। এঁরা সবাই ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’। মিল পেলেন?

অবশ্য প্রধানতম বলির পাঁঠা এক্ষেত্রে মুসলিমরাই। এন-আর-সি নামক মানুষকে না-মানুষ বানানোর প্রক্রিয়া সেই ছায়াশত্রুকে মাত দিতে চাইছে। যদিও অসমে এর ফলে মুসলিমদের চেয়ে হিন্দুরাই নাগরিকত্ব হারালেন বেশি এবং প্রমাণিত হল যে মুসলিমদের বহুল সংখ্যায় অবৈধ নাগরিকত্ব একটি মিথ মাত্র।
৪. সামরিক আধিপত্য – দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ ও সমস্যা অবহেলা করেও সামরিক বাহিনীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীন বা পাকিস্তানকে জব্দ করার মিথের উপর ভিত্তি করেই নির্বাচন জেতা যায়। মিল পাচ্ছেন?
৫. উৎকট লিঙ্গবৈষম্য – ফ্যাসিবাদী দেশগুলোতে প্রায় একচেটিয়া ভাবেই সরকার হয় পুরুষ-আধিপত্যাধীন। ফ্যাসিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের প্রথাগত ভূমিকা অনমনীয়ভাবে পালিত হয়। বিবাহ-বিচ্ছেদ, গর্ভপাত বা সমকামিতা নিষিদ্ধ হয়। রাষ্ট্রকে উপস্থাপন করা হয় পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত অভিভাবক হিসাবে। উত্তরপ্রদেশে নারীর অবস্থান দেখুন। সমকাম নিয়ে রাষ্ট্রের মনোভাব দেখুন। এখনও মিল পেলেন না?
৬. নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম – সাধে কি বিদ্রোহী চাষীদের নিজস্ব মিডিয়া খুলতে হয়? মিল পেলেন না?
৭. জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে প্রচণ্ড ঔৎসুক্য – জনসাধারণকে বৈদেশিক শত্রুর ভয় দেখিয়ে উত্তেজিত রাখা হয়। চিন, পাকিস্তান…আবারও।
৮. ধর্ম ও রাষ্ট্র  অঙ্গাঙ্গী জড়িত থাকে
–হিন্দুরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে চলেছে, অথচ আপনি এখনও মিল খুঁজে পাচ্ছেন না।
৯. বড় পুঁজির সঙ্গে দহরম-মহরম – ফ্যাসিবাদে দেশে অনেক সময়েই বনেদি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোই সরকারকে ক্ষমতায় আনে। সরকার ও এসব প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সুবিধাজনক লেনদেনের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আম্বানি হন দেশের রাজা। মিল পেলেন?
১০. শ্রমিক-কৃষকদের ক্ষমতা রোধ – যেহেতু খেটে খাওয়া মানুষের সাংগঠনিক শক্তি ফ্যাসিবাদী সরকারের জন্য হুমকি স্বরূপ,  তাই এখানেও এসে গেছে কৃষি আইন-শ্রমকোড। আরও মিল চাই?
১১. বুদ্ধিবৃত্তি ও শিল্পের প্রতি অবজ্ঞা – ফ্যাসিবাদী দেশগুলো প্রায় সময়েই উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষায়তনের সঙ্গে খোলাখুলি বৈরিতা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করা বা তাঁদের বক্তব্য সেন্সর করা বিরল নয়। শিল্প ও সাহিত্যাঙ্গনে স্বাধীনভাবে কথা বলতে গেলে সরাসরি আক্রমণ করা হয়। ভারতের সঙ্গে মিল পাওয়া গেল?
১২. অপরাধ ও শাস্তির বিষয়ে মাত্রাহীন আগ্রহ – ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় পুলিশকে আইন প্রয়োগের নামে প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়। দেশপ্রেমের নামে চলে পুলিশি নির্যাতন। লাঠির গুঁতো মেরে পুলিশ যাকে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াচ্ছিল দিল্লিতে, সেই ছেলেকে মনে পড়ে?

১৩. অবাধ স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি– কর্পোরেট স্বজনদের প্রতি প্রীতি দেখতে পাচ্ছেন না নাকি দুর্নীতি করে তাদের বিদেশে পালানো দেখতে পাচ্ছেন না? RTI করে আপনি দুর্নীতির তল পাবেন, সে উপায়ও তো বন্ধ! মিল পাচ্ছেন?

১৪. নির্বাচনে কারচুপি – ফ্যাসিবাদী দেশে নির্বাচন মানেই সম্পূর্ণ ধোঁকাবাজি। এমএলএ-এমপি ক্রীত হচ্ছেন এখানে। মিল পেলেন?

***

আমাদের মনে হয়েছে, বাংলার নির্বাচনে বামপন্থীদের প্রধান রাজনৈতিক কাজ তাই ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘ-বিজেপির বিরোধিতা করা। কিন্তু সিপিআইএম-এর মতে, রাজ্যে তৃণমূল প্রধান শত্রু। ফলে বেধেছে বিরোধ। বিজেপি নিজেও শুধুমাত্র নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমিত দলমাত্র হলে আমরা এতটা ভয় পেতাম না। ভারতবর্ষে সঙ্ঘ-বিজেপির শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়েছে, তা আমাদের ভীতির কারণ। ফ্যাসিস্ট সঙ্ঘ-বিজেপির বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ, তাকে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধই হতে হবে।

যাঁরা মনে করেন বিজেপি ‘দেশের বিপদ’,  কিন্তু ‘রাজ্যের বিপদ’ তৃণমূল, তাঁদের প্রচারকে আমাদের আত্মঘাতী মনে হচ্ছে।   সীতারাম ইয়েচুরি বলছেন, তৃণমূলের ওপর বাংলার জনগণের রাগ ভোট হয়ে তাঁদের (মানে বাম-কংগ্রেস জোটের) পক্ষে যাবে। কিন্তু যদি তাঁরা তৃণমূল বিরোধিতা না করেন, ওই ভোট নাকি বিজেপির কাছে চলে যাবে।  কিন্তু তৃণমূল বিরোধী ভোট এমনিতেই তাঁদের কাছে আসবে, বিজেপির ফ্যাসিস্ত চেহারা উদঘাটন না করলেও সে ভোট বিজেপিতে যাবে না-এটা কী করে ধরে নেওয়া গেল, তা বোধগম্য হল না। বোধগম্য হল না, কেন গ্রাম বাংলার আপামর জনগণ যখন তৃণমূলের অপশাসনের ফলে বিজেপিকেই  সহায় ভাবছে, তখন চোখে ঠুলি পরে তাঁরা তুমুল বিজেপি-বিরোধিতার প্রয়োজন দেখছেন না, বরং ভাবছেন এমনিতেই তৃণমূল-বিরোধী ভোট তাঁদের কাছেই আসবে!

বঙ্গীয় সিপিআইএম তৃণমূলের ওপর তাঁদের সহজাত জাতিক্রোধ ছেড়ে (বা না ছেড়ে সেই সঙ্গে) বড় রাজনীতির কথা খানিক ভাবলে ভাল হয়। আর তা যদি তাঁরা না করেন, তাহলে সিপিআইএম-কংগ্রেস ও তৃণমূল পারস্পরিক খিস্তিবিনিময় করতে থাকুন। কিন্তু এর ফলে যে ‘রাজনৈতিকভাবে বিজেপি-বিরোধিতা’-র ক্ষেত্রে শূন্যস্থানটি তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ করার কাজটি আমরা করছি।
বিজেপি-বিরোধিতা আমরা করে যাব। ভোটের আগেও, পরেও। সিপিআইএম তার জোটসঙ্গী সহ সেই প্রচারকে পারলে ‘এনক্যাশ’ করুক ! তাতে  কারও আপত্তি নেই।

[মতামত লেখিকার নিজস্ব]

[নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন? আপনার ভাবনা ৫০০ শব্দের মধ্যে লিখে আমাদে র পাঠিয়ে দিন। আমাদের যোগাযোগ:

e-mail: edeshaamar@gmail.com

Whatsapp: 8902499477

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on কেন ‘নো ভোট টু বিজেপি’

Leave A Comment