অমিত শাহের ভাষণের পর মতুয়াদের মধ্যে ব্যাপক নিরাশা ও ক্ষোভ

আজকের খবর বিভাগ-বহির্ভূত সবচেয়ে জনপ্রিয়

Last Updated on 7 months by admin

নিজস্ব সংবাদদাতা , 16 ই ফেব্রুয়ারী  2021, 1:40 AM

গত ১১ই ফেব্রুয়ারী, কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঠাকুরনগরের হাইস্কুল মাঠে এক জনসভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান বক্তা হয়ে। নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্র সরকার-এর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি স্পষ্ঠভাবে কি বলেন তা শোনার জন্য, ঐ সভায় কয়েক হাজার মতুয়া-অনুগামী  উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সভার পর মতুয়ারা অমিত শাহ এবং কেন্দ্র সরকারের আচরণে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

আমরা ঠাকুরনগর গেছিলাম মতুয়াদের ক্ষোভের কারণ জানতে। নাগরিকত্ব নিয়ে মতুয়ারা কি ভাবছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরবাড়ীর এক আবাসিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “ BJP-RSS ব্রাহ্মণ্যবাদী একটি শক্তি। ঠাকুর হরিচাদ এবং গুরুচাদ ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ওরা আমাদের কোনোদিনই নাগরিকত্ব দেবে না। ভোটের আগে ওরা আসলে রাজনীতির খেলা খেলছে।” তিনি আরোও বলেন, “আমাদের যদি ওরা এতই সম্মান করেন তবে রাম মন্দিরের ভিত্তি পুজার অনুষ্ঠানে ঠাকুরবাড়ীর পাঠানো জল আর মাটি ফিরিয়ে দিল কেনো? রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ দলিত বলেই কি ঐ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন না?” আমরা ওনাকে প্রশ্ন করলাম – “কিন্তু মতুয়া সঙ্ঘাধিপতি শান্তনু ঠাকুর তো এটাকে অপপ্রচার বলছেন?’’ উনি জানান যে সমগ্র অনুষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজে শান্তনু ঠাকুরের দাবির কোন সত্যতা নেই।

যতজন মতুয়া সদস্যদের সাথে কথা হল, প্রায় সকলের মধ্যেই গভীর নিরিশা ও প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি তীব্র। শেষ পর্যন্ত তাদের আশা ছিল যে কমপক্ষে নির্বাচন জেতার জন্য অমিত শাহ-রা  নির্বাচনের আগে তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি সমাধান করে দেবেন। কিন্তু অমিত শাহের বক্তব্য তাদের বেশিরভাগেরই ‘বোকা বানানোর চেষ্টা’ বলে মনে হয়েছে।  ঠাকুরনগর শিমূলপুরের বাসিন্দা দীপক বিশ্বাস বলেন , “আমাদের ভোটার কার্ড ও রেশন কার্ড আছে মানেই আমরা এদেশের নাগরিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য CAA লাগু করার কথা বলছেন। CAA-তে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড ও আধার কার্ড ছাড়া সরকার যা যা কাগজপত্র চাইছে মতুয়াদের ৯০% মানুষই তা দেখাতে পারবে না।সামনে বিধানসভা ভোট আছে তাই উনি আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন।” আসলে বিজেপি সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিতে চায় না, বলেই চর্চা শুরু হয়ে গেছে।

তবে কেউ কেউ এখনও বিজেপি-র ওপর ভরসা রাখতে চান।  পেশায় চাকরিজীবি শিমূলপুরের বাসিন্দা, বছর পঞ্চাশের সৌনব বিশ্বাসের মতে “ ভোটার কার্ড থাকলেই কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়া যেতে পারে না। নাগরিকত্ব পেতে গেলে সরকারকে আলাদাভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি কেন্দ্র সরকারের উপর এবিষয়ে আশাবাদী।” তিনি এও বলেন, “সরকার CAA-তে ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত এদেশে আগত শরণার্থীদের শেল্ফ ডিক্লারেশন দিতে বলেছেন কেন তারা এদেশে এসেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মতুয়াই ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড অথবা আধার কার্ড ছাড়া অন্য কোনো কাগজ দেখাতে পারবে বলে মনে হয়না।” চিকনপারার ২১ বছরের এক যুবক বলে, “অমিত শাহ কথা দিয়েছেন ভ্যাক্সিন দেওয়ার কাজ মিটলেই আমাদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজ শুরু করবেন। তাই এরাজ্যে আমরা বিজেপিকেই সরকারে চাইছি।” CAA-তে আসামে ১৫ লক্ষ হিন্দুর নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুবকটি বলে, “আসাম নিয়ে কিছু বলতে পারবো না।”

কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতুয়া অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও অপমাণিত বোধ করছেন। এক অজানা ভয়ও  তাদের মধ্যে বাসা বেঁধেছে বলে অনুভূতি হল।   নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবীন এক মতুয়া বলেন, “ প্রথমত, অমিত শাহ যে ভ্যাকসিন দেওয়ার কাজ শেষ করার পরে আমাদের নাগরিকত্ব দেবেন বলছেন, তা সম্পূর্ণ অজুহাত ছাড়া আর কিছু না। দ্বিতীয়ত, সরকারের ভ্যাকসিন দেওয়ার যা দৌড় তা শেষ হতে সময় নেবে বহু বছর। ততদিনে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আর থাকবে না। কৃষক আন্দোলন যেভাবে এগোচ্ছে তাতে ২০২৪-এই এরা হারবে। শেষত, মতুয়া ধর্ম সর্ব-ধর্ম সমন্বয়ের কথা প্রচার করে। বাংলাদেশের  তিনকড়ি মিঞা তো একজন মুসলিমই ছিলেন। তাঁর অনুগামী অসংখ্য মুসলিম বাঙালি ভারত এবং বাংলাদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন। আমরা শরণার্থী হিসেবে এদেশে আসা হিন্দু ও মুসলিম সহ সকলেরই নাগরিকত্ব চাই।”

ক্রিশ্চান পাড়া, পাতলা পাড়া, এবং চিকন পাড়ার প্রবীন মতুয়া চিত্ত মন্ডল, সুরথ মোহন্ত, ননীগোপাল বিশ্বাস সকলেই সমস্বরে দাবি করেন, “আমরা কোন কাগজ দেখাতে পারবো না। মতুয়ারা নিঃশর্তভাবে নাগরিকত্ব চায়।” হাইস্কুল পাড়ায় থাকেন এক প্রবীন হরিপদ মিস্ত্রি বলেন, “সেই বল্লাল সেনের আমল থেকে, আমাদের আট পুরুষ ভিটেমাটি ছেড়ে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মতুয়ারা আর অন্যায় সহ্য করবে না। আমরা নিঃশর্ত নাগরিকত্ব না পেলে কোনো সরকারকেই ছেড়ে দেবো না।”

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on অমিত শাহের ভাষণের পর মতুয়াদের মধ্যে ব্যাপক নিরাশা ও ক্ষোভ

Leave A Comment