হাওড়ার ফুলেশ্বরের কটন মিলের শ্রমিকদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন শ্রমিকরা

আজকের খবর গণ-আন্দোলন বিশেষ খবর শ্রমিক-আন্দোলন

Last Updated on 4 months by admin

মৃগাঙ্ক মন্ডল, হাওড়া, ৩১ মে, ২০২১ :

যুগের পর যুগ ধরে সমাজের এক প্রকার বাবু শ্রেণি লুটতরাজ করে চলেছে, কৌশলে সমাজের মূল চালকদের পেটে লাথি মেরে সাম্রাজ্য গুটিয়ে পালিয়ে গেছে আর সেই জায়গায় এসে বসেছে আবার এক রক্তচোষা বাদুড়। পুনরায় ঘটনার পুনরাবৃত্তি, রক্ত শোষণ, লুটতরাজ মালিক বদল। এ রকমই একটা দীর্ঘ ইতিহাস সংক্ষেপে উদ্ঘাটন করছি।

সালটা ১৯৪৮, হাওড়ার ফুলেশ্বরে নদীতীরে স্থাপিত হয় ‘শ্রী হনুমান কটন মিল প্রাইভেট  লিমিটেড’। ভালোভাবেই বহু বছর ধরে চলতে থাকে কোম্পানি। হঠাৎ করে ১৯৮৪ সালের ৭ই জুলাই থেকে বন্ধ হয়ে যায় মিল। চলতে থাকে শ্রমিকদের সাথে মালিকপক্ষের বিরোধ। শতাধিক মানুষের রুজি-রোজগার নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল। এরপর বেশ কিছুদিনের লড়াইয়ের পর পুনরায় চালু হলো কারখানা। এরপর দ্বিতীয় ধাক্কা লাগল ১৯৯০ সালে। ১৯৯০-৯১ এক বছর সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হল মিল এবং এক বছর পর ১৯৯১ সালে মিলের মালিকানা হস্তান্তর করা হলো। অবন্তী কঙ্কারিয়া লিকুইডেশন এর মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে ১কোটি ৮৪ লক্ষ টাকায় কিনে নিলেন ফ্যাক্টরির মালিকানা। ‘শ্রী হনুমান কটন মিল’ নাম পাল্টে হলো ‘সাইন-আপ ফাইবার লিমিটেড’। ১৯৯১-৯৪ সাল পর্যন্ত পিএফ না কেটে শ্রমিকদের কাজ করানো হতো। ১৯৯৪ সালে সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন পিএফ দপ্তরে অ্যাপ্লিকেশন পাঠায় এবং পিএফ দপ্তর থেকে কোম্পানির উদ্দেশ্যে নির্দেশ আসে পিএফ কাটার জন্য। কিন্তু তারপরেও সাইন -আপ গোষ্ঠী থাকে উদাসীন। এরপর চার দিনের স্ট্রাইক এর পর পিএফ শুরু হয়।

ঠিক ৮ বছর পর সময়টা ২০০২, ১২ মার্চ  ‘সাইনআপ প্রাইভেট লিমিটেড’ বন্ধ হয়ে গেল। আবার মালিকানা হস্তান্তর, এবার ‘সাইনআপ’ নাম পাল্টে হল ‘এম এফ এল প্রাইভেট লিমিটেড’। নতুন মালিকপক্ষ পুরাতন শ্রমিকদের কাজে নিতে চাইল একটি শর্তে যে, সাইন আপ কোম্পানি থেকে তারা রিজাইন দিলে তবেই তারা ‘এম এল এফ’-এ কাজ করতে পারবে। এখন একটা কথা কেউ কেউ বলতে পারে যে – তাহলে তো ভালই! শ্রমিকদের তো কেউ কাজ হারালো না। আদতে ভালো কিছুই নয়, আসলে নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের পিএফ এর টাকা দশ বছর কাটার পর তবেই পেনশন শুরু হয় এবার কোনও কোম্পানি যদি ১০ বছরের আগে যে কোন কারণবশত বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আর পেনশনের টাকা শ্রমিক শ্রেণীকে ফেরত দিতে হবে না এবং এক্ষেত্রেও দেখা গেল পিএফ এর টাকা কাটা শুরু হওয়ার ঠিক ৮ বছরের মাথায় কোম্পানির মালিকানা বদল হয়ে গেল এবং নতুন মালিক এসে নতুনভাবে কর্মী নিয়োগ শুরু করলো কিন্তু সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে ৩৫৯ জন শ্রমিক সাইনআপ থেকে রিজাইন দিতে রাজি হলেন না। তারা কারখানার পুরনো শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে চাইলেন কিন্তু মালিকপক্ষ তা মানতে রাজি নয় নিজের ক্ষতি বা লোকসান করে কোনো মালিকপক্ষই শ্রমজীবী মানুষদের জন্য উপকারী সিদ্ধান্ত নেয় না। এবার একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে শ্রমিকরা রিজাইন করেন নি কেন? তার খুব সোজা উত্তর – একবার সাইন আপের কর্মী পদ থেকে রিজাইন  করলে শ্রমিকদের পিএফ-এর টাকা পাওয়ার শেষ আশাটুকুও থাকত না এবং সর্বোপরি মালিকপক্ষ বর্বর আক্রমণ নামিয়ে আনত শ্রমিকদের উপর যা এই শ্রমজীবী মানুষরা মেনে নিতে পারেন নি।

এই ২০০২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ৩৫৯ জন রিজাইন না করা শ্রমিকরা সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এক বছর ধরে কোম্পানি বন্ধ থাকার দরুন FAWLOI বাবদ মাসিক ভাতা শুরু করার দাবি জানায় লেবার ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গলের কাছে। কিন্তু কোম্পানি চালু হয়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে লেবার ডিপার্টমেন্ট ওই দাবি নাকচ করে। এরপর ২০০৩ সালে সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন হাইকোর্টে পিটিশন জমা দেয় বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের ভাতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালে হাইকোর্ট তৎকালীন সময়ে রাইটার্স এর দপ্তরে স্ক্রীনিং কমিটিকে অনুরোধ করে ভাতা দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু এখানেও স্ক্রীনিং কমিটির সেক্রেটারি কালী ঘোষের নেতৃত্বে, কোম্পানি চলছে এই ভ্রান্ত অজুহাত দেখিয়ে‌ FAWLOI এর বিষয়টি নাকচ করে দেওয়া হয়।

এরপর ২০০৭ সাল নাগাদ সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন পুনরায় হাইকোর্টে পিটিশন জমা দেয়। এইবার সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষে মামলা লড়েন হাইকোর্টের আইনজীবি অরুণাভ ঘোষ। হাইকোর্টে অরুণাভ ঘোষ ‌যুক্তি দেন,কোন শ্রমিক কারখানা থেকে রিজাইন করবে কিনা সেটা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার কোন ইউনিয়ন তাকে ফোর্স করতে পারেনা। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় যেহেতু লেবার গেজেট দপ্তর এর তথ্য অনুযায়ী ‘সাইনআপ ফাইবার লিমিটেড’ বন্ধ কারখানার মধ্যে পড়ে, তাই শ্রমিকদের বকেয়া সহ এককালীন ৪২০০০ টাকা এরিয়ার ও মাসিক ভাতা চালু করতে হবে। এরপর ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে রাজ্য সরকার শ্রমিকদের এককালীন‌ ৪২০০০ টাকা এরিয়ার ও তৎকালীন সময়ে মাসিক ৭৫০ টাকা ভাতা দিতে শুরু করে, যা ২০১০ সালে বেড়ে হয় ১৫০০ টাকা। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হল ২০১০ সালে ১৫০০ টাকা হওয়ার পর – আজ ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত (এগারো বছর) সেই ভাতার টাকা দেড় হাজারের থেকে এক টাকাও বাড়েনি; অথচ বেড়ে চলেছে বাজারদর।

সাইনআপ ফাইবার লিমিটেড নাম বদলে এম এফ এল রাখার পরেও বহুবার বহু সময়ে বিভিন্ন রকমের নাম বদলে গেছে কঙ্কারিয়া গোষ্ঠী,কখনো তারা নাম রেখেছে আশিস ফাইবার কখনো আবার ঊষা ফাইবার আবার সম্প্রতি সেই নাম বদলে হয়েছে‌ ইয়াজুর ফাইবার প্রাইভেট লিমিটেড। ১৯৮৪সালে মফতলালদের থেকে কঙ্কারিয়া গোষ্ঠী কারখানার জায়গা কিনে নিলেও‌‌ শ্রমিক বসতি অঞ্চল নিজেদের অধীনস্থ করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও তারা অন্যায় ভাবে শ্রমিকদের এই জমিকে‌ নিজেদের বলে দাবি করে এবং গাজোয়ারি ভাবে তাদের তুলে দিতে চায়। এর আগে ২০১০ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে লেবার লাইন ভেঙে দিতে উদ্যত হয় কঙ্কারিয়া গোষ্ঠীর গুন্ডাবাহিনী। কিন্তু শ্রমিক ঐক্যের কাছে তারা হার মানতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে‌‌ ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পুনরায় লেবার লাইনে হামলা চালানো হয় কঙ্কারিয়া গোষ্ঠীর তরফ থেকে। আজ, ৩১ মে, ২০২১ জেসিবি নিয়ে এসে উপড়ে ফেলা হয় লেবার লাইনের জমিতে পোঁতা বহু‌ গাছ।  শুধু হামলা করাই নয় মালিকপক্ষ বহুদিন ধরে জমি জবর দখলের জন্য এসডিও কোটে মামলা করে চলেছে কিন্তু কোর্টের নির্দেশ মতো ওই জমি যে আদতে তাদের সেই দলিল দেখাতে না পারায় মামলা খারিজ হয়ে যায়। বর্তমানে জানা যায় এখনো এরকম একটি মামলা চলছে। এই করোনা পরিস্থিতি এবং যশ নামক ঝড়ের বিপর্যয়কালীন সময়ে কোম্পানি‌ পক্ষ স্থানীয় তৃণমূল বিধায়কের সাহায্য নিয়ে এলাকায় কমিউনিটি কিচেন তৈরি করে এবং সুযোগ বুঝে আজ, ৩১ মে বেলা ১০ টায় জেসিবি এনে লেবার লাইন এ উচ্ছেদ কর্মসূচি‌ গ্রহণ করে। সেই মুহূর্তে সংগঠিতভাবে এলাকার মানুষ উচ্ছেদ ক্রিয়া আটকে দেন এবং স্থানীয় থানায় ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়। বিকেলে বনদপ্তর এর কর্মীদের ডেকে দেখানো হয় এলাকার অবস্থা। আপাতত ভাবে সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন  রামবচন সিং, প্রেমানন্দ দাঁ‌ র নেতৃত্বে মালিক পক্ষের এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থামিয়ে দিয়েছে ; কিন্তু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি সংকটহীন নয়। মুন্না তিওয়ারিরা বলেন – তারা রাত জেগে পাহারা দেবেন। মালিকপক্ষের এইরকম জবরদখল মূলক আগ্রাসী মনোভাবের‌ বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া রুখতে, রামবচন সিং – মুন্না তিওয়ারির  মতো সংগ্রামী শ্রমিকেরা প্রতিজ্ঞা বদ্ধ।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on হাওড়ার ফুলেশ্বরের কটন মিলের শ্রমিকদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন শ্রমিকরা

Leave A Comment